২০০৭ সালে “মাইনাস টু ফর্মুলার” যে রাজনৈতিক সমীকরণ জন্মেছিল—বয়ে আনল নির্মম উল্টোফেরা ও অন্তর্লীন সত্যের প্রকাশ।
ভূমিকা: এক অদ্ভুত রাজনৈতিক গণিতের জন্ম
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত অধ্যায়—এটি শুধু একটি সাংবিধানিক বিপর্যয় ছিল না; বরং ক্ষমতার মঞ্চে সুপরিকল্পিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র জন্ম।
এই ফর্মুলা ছিল দুই শীর্ষ নেত্রীকে রাস্তা সরিয়ে দিয়ে একদল নতুন ক্ষমতাকাঙক্ষীর উত্থানের ব্লুপ্রিন্ট।
তবে আজ ইতিহাসের চাকা ঘুরে প্রমাণ করছে— যে সমীকরণ অন্যকে বাদ দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত মাইনাস করেছে নিজেরই কারিগরদের। বালা বাহুল্য এখনো মাইনাস টু ফর্মুলার কারিগররা সক্রিয়।
ওয়ান-ইলেভেনের আঁতাত: অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের নগ্ন সত্য
মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মইনুদ্দিন–ফখরুদ্দিন-ভারত ত্রয়ী তো ছিলই, কিন্তু তার চেয়েও বড় ভূমিকা ছিল দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের ভেতরের লুকোনো চরিত্রদের—
সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী, এবং দলের নেতৃত্বকে দূরে ঠেলে নিজেরা নেতৃত্বে বসার স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তিরা।
এই অভ্যন্তরীণ কুশীলবদের সহযোগিতা ছাড়া
মাইনাস টু ফর্মুলা কখনোই এত গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারত না।
কারিগরদের পরিণতি: ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধ
মইন–ফখরু–ভারত ত্রয়ীর পরিকল্পনায় যে নেত্রী ছিলেন প্রধান বাহক, যাঁর কাঁধে ভর করে ‘দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা স্থায়ী রাখার’ স্কিম তৈরি হয়েছিল, আজ তা ইতিহাসের নির্মম বিদ্রুপে— বিদেশে পালিয়ে, মানসিকভাবে ভগ্নদশায়, কার্যত মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে এক অজানা আতঙ্ক গৃহবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন।
এ যেন সেই প্রবাদটির বাস্তব প্রতিফলন—
“যে বীজ তুমি অন্যের জন্য বপন করো, সেই বিষাক্ত ফল একদিন তোমাকেই খেতে হবে।”
এদিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের নেত্রীকে ঠুনকো মামলা, কারাবাস, এবং চিকিৎসাবঞ্চনার মাধ্যমে মাইনাস করার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতার এক চরম উদাহরণ হয়ে থাকবে।
মাইনাস অপারেশন: দলীয় রাজনীতিতে আজও সক্রিয়
দলের ভেতরে থাকা কিছু নাটের গুরু আজও বহাল তবিয়তে— নেত্রীকে একের পর এক সংকটে ফেলতে এগুলোই মূলত রিমোট কন্ট্রোল পরিচালনা করে আসছে।
বিদেশে চিকিৎসার বিষয় নিয়ে চিঠি দেওয়া–নেওয়ার নাটক, পক্ষান্তরে নিজেদের জন্য বিদেশে সু-চিকিৎসা নিশ্চিত করা, আর দলের পরবর্তী নেতাকে আজও লন্ডনে আটকে রাখা—
এসবই মাইনাস অপারেশনের চলমান প্রমাণ। মায়ের জীবনসংকটেও তাঁর দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ—
যা দলের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের অদৃশ্য প্রাচীরকে আরও স্পষ্ট করে।
অতঃপর পর্যালোচনা এই যে-
১. মাইনাস রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি
যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জনগণের ম্যান্ডেট নয়, বরং গোপন আঁতাত দ্বারা নির্ধারিত করা হয়— তখন গণতন্ত্র থাকে না, থাকে কেবল ‘ব্যবস্থাকেন্দ্রিক ক্ষমতার খেলা’।
২০০৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেই খেলার পরিণতি ভোগ করছে।
২. ষড়যন্ত্রকারীরা নিরাপদ—এটাই রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। যারা নেতাদের বিরুদ্ধে ছক কষে অস্থিরতা তৈরি করেছিল, তারা আজও— উচ্চপদে, ব্যবসায়িক স্বার্থে, রাজনৈতিক আশ্রয়ে নিরাপদভাবে টিকে আছে। এটি নাগরিক হিসেবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক; কারণ অপরাধের বিচার না হলে ভবিষ্যতে একই ষড়যন্ত্র আবার ফিরে আসে।
৩. ইতিহাস কখনো কাউকে ছাড় দেয় না। মাইনাস টু ফর্মুলার জন্ম হয়েছিল দুই নেত্রীকে বাদ দিতে, কিন্তু দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাদ পড়েছেন— ফর্মুলার প্রধান কারিগর,
তাঁর আন্তর্জাতিক আশ্রয়দাতা শক্তি, এবং সেই আস্থার নেত্রী ও অন্যান্য কুশীলবরা, যারা ভেবেছিলেন নিজ দলের যোগ্যদের বাদ দিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বী এর রাজনৈতিক দল ও নেতা-নেত্রীদের ওপর নির্যাতন জুলুম কারাবন্দি গুম খুন করে নিজে আমৃত্যু ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবেন।
আজ তারা সবাই একে একে ইতিহাসের ভুলে যাওয়া অধ্যায়ে পরিণত হচ্ছেন।
৪. জনগণের প্রশ্ন—এই মাইনাসের খেলা থামবে কবে? ১৫ বছর ধরে মাইনাস অপারেশনের বিষাক্ত ছায়া রাজনীতিকে দুর্বল করেছে, গণতন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, এবং ক্ষমতার টুলস হিসেবে পরিণত করেছে মামলাকে, চিকিৎসাকে, নির্বাসনকে।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “মাইনাস টু” এখন এক প্রতীক—
ক্ষমতার অন্ধ লালসা, বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্মম উল্টোফেরার প্রতীক।
যাদের মাইনাস করার জন্য এত ছক, এত ষড়যন্ত্র, এত নিষ্ঠুরতা— তারা আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছেন।
কিন্তু যারা ছক কষেছিল, তারা ক্ষমতার মঞ্চ থেকে নিজেই মাইনাস হয়ে ইতিহাসের অন্ধকার পাতায় হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।