
“কাজী জেসিনের সংস্কার উদ্যোগে আমলাতান্ত্রিক শেকল | ১৪ সেপ্টেম্বরের গোপন স্মারকে হাত-পা বাঁধা গ্রেড-১ ডিজির | রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন বনাম পুরোনো আধিপত্যের দ্বন্দ্ব”
বিশেষ অনুসন্ধান | আমার টেলিভিশন | ঢাকা:
বাংলাদেশ টেলিভিশনকে (বিটিভি) বছরের পর বছর ধরে চেপে ধরা অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্ত করে একবিংশ শতাব্দীর একটি আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য সম্প্রচারমাধ্যমে রূপান্তরের পথ কি শুরুতেই থমকে যাচ্ছে? বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিনকে সচিব পদমর্যাদায় (গ্রেড-১) মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর যখন বিটিভি সংস্কারের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই সামনে এলো মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা সংকোচনের নজিরবিহীন নির্দেশিকা। সরকারের সংস্কার ভাবনার বিপরীত স্রোতে হাঁটা এই আমলাতান্ত্রিক পদক্ষেপ রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যমের প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
২০২৬ সালের ৬ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কাজী জেসিনকে ১ বছরের মেয়াদে চুক্তিভিত্তিক বিটিভি ডিজি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—এই পদটি জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড-১ (সচিব সমমর্যাদা) ভুক্ত এবং তদানুযায়ী যাবতীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধিবিধান প্রয়োগের অধিকার তাঁর থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—নিয়োগ পত্রে সচিবের সম্মান দেওয়া হলেও বাস্তবে কি তাঁর হাত-পা বেঁধে রাখা হচ্ছে?
১৪ সেপ্টেম্বরের গোপন স্মারক: ক্ষমতা খর্বের চিত্র
‘আমার টেলিভিশন’-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের টেলিভিশন অনুবিভাগ থেকে জারিকৃত একটি প্রশাসনিক স্মারকের তথ্য (স্মারক নং: ১৫.০০.০০০০.০২৪.২৪.০০১.২৪-৪১২)। সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করা এই গোপনীয় নির্দেশনার মাধ্যমে বিটিভি মহাপরিচালকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত করে মন্ত্রণালয়ের ‘পূর্বানুমোদন’ (prior approval) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ের এই আদেশের ফলে মূলত তিনটি স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সংস্কার কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে:
১. স্ক্রিন, গ্রাফিক্স ও দৃশ্যমান পরিচিতি: বিটিভির লোগো আধুনিকায়ন, স্ক্রিন প্রেজেন্টেশন ও গ্রাফিক্স প্যাকেজ পরিবর্তনের মতো সম্পূর্ণ পেশাগত ও সৃজনশীল বিষয়েও ডিজির একক নির্বাহী এখতিয়ার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
২. ডিজিটাল কনটেন্ট ও সামাজিক মাধ্যম: বর্তমান দ্রুতগতির ডিজিটাল সম্প্রচারের যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বার্তা বা কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদনের শর্ত চাপানো কালক্ষেপণ ও অকার্যকারিতার জন্ম দিচ্ছে।
৩. অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ও পদায়ন: সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়টি প্রশাসনিক খাতেই। বিটিভির অভ্যন্তরীণ সংস্কার, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বদলি, জনবল ব্যবস্থাপনা, শিল্পী অডিশন ও গ্রেডেশনের ক্ষেত্রে ডিজির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে।
আইনি কাঠামোর সংঘাত: প্রধান নির্বাহী নাকি নিছক পদবী?
বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১-এর ধারা ১১ অনুযায়ী, মহাপরিচালক হলেন প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ (CEO)। আইনানুযায়ী তিনি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন ও প্রশাসনিক কার্যাবলি পরিচালনা করবেন।
কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক বৈপরীত্য। একদিকে সরকার একজন বিশিষ্ট পেশাদার গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বকে সচিব মর্যাদায় বসিয়ে বিটিভিকে আধুনিক করার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ আমলাতন্ত্র দৈনন্দিন কাজের এখতিয়ারও নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন যেখানে বিটিভি, বেতার ও বাসসকে যুক্ত করে স্বায়ত্তশাসিত ‘জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা’ গঠনের সুপারিশ করছে, সেখানে মন্ত্রণালয়ের এই অতি-নিয়ন্ত্রণ পুরোনো ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক চর্চাকেই মনে করিয়ে দেয়।
সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা ও নথির গোপনীয়তা:
বিটিভিতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অনিয়ম, অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেন এবং অডিট আপত্তির বিরুদ্ধে যখনই নতুন ডিজি কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছেন, তখনই নেপথ্যের শক্তিসমূহ সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত এবং দুদক (দুদক)-এর অনুসন্ধানে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়া হয়েছে।
১৪ সেপ্টেম্বরের সংবেদনশীল স্মারকটি সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে দাপ্তরিক গোপনীয়তার আড়ালে রাখা হয়েছে। তথ্য পাওয়ার অধিকার রুদ্ধ করার এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বা ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ কেবল প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পরিবর্তনবিরোধী সিন্ডিকেটকে সুরক্ষার সুযোগ করে দেয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে হাতিয়ার করে একটি শীর্ষ চক্র ডিজির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং সংস্কার উদ্যোগ ভণ্ডুল করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমকর্মীগণ।
নীতিগত তদারকি বনাম অযাচিত খবরদারি:
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিভির ওপর সরকারের ‘নীতিগত তদারকি’ (Policy Oversight) থাকা যৌক্তিক। কিন্তু নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া আর প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে ‘মাইক্রোম্যানেজমেন্ট’ বা ক্ষুদ্র প্রশাসনিক বিষয়ে জবাবদিহির শৃঙ্খলে বন্দি করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
কাজী জেসিন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিটিভিকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফেরাতে অর্গানোগ্রাম সংস্কার, শিল্পী সম্মানী বৃদ্ধি এবং সংবাদ পরিবেশনায় পেশাদারিত্ব আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। খোদ সরকারপ্রধানও বিটিভিকে একটি আধুনিক চ্যানেল হিসেবে দেখতে চান। তবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য ও অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে সেই রূপকল্প বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
আমলাতন্ত্রের শিকল ভেঙে পেশাদারিত্বের দাবি:
বিটিভির এই সংকট কেবল একজন ব্যক্তির ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। কাজী জেসিন বা অন্য যেকোনো পেশাদার ব্যক্তি ডিজি পদে থাকুন না কেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিটিভিকে গণমানুষের গণমাধ্যমে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
আমলাতান্ত্রিক খবরদারি ও শৃঙ্খল দিয়ে সম্প্রচারমাধ্যমের আধুনিকায়ন অসম্ভব। বিটিভিকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে পেশাদার গণমাধ্যম বিসিএস ক্যাডার গঠন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং গ্রেড-১ পদমর্যাদার ডিজিকে আইনানুযায়ী পূর্ণ নির্বাহী স্বাধীনতা দেওয়া জরুরি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উচিত তদারকির নামে বাধা সৃষ্টি না করে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করা; অন্যথায়, ‘মেধা বনাম আমলাতন্ত্রের’ এই দ্বন্দ্ব কেবল বিটিভির আধুনিকায়নকেই পিছিয়ে দেবে না, বরং পুরোনো দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকেই পুনরুজ্জীবিত করবে।