October 24, 2026, 3:37 am
শিরোনাম :
ফেসিয়াল প্লাস্টিক সার্জারি: চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মেলবন্ধন বিটিভি: ​চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া বিটিভির আধুনিকায়ন কেবলই অর্থের অপচয়  শিশুর হাসিতে ফিরুক আত্মবিশ্বাস: প্লাস্টিক সার্জারিতে নিখুঁত রূপ পাচ্ছে বিকৃত ক্ষতচিহ্ বিটিভি কর্মীর মৃত্যু, তিন মাসের বেতন বকেয়ার প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কি লাল ফিতার ফাঁদে? তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার অপসারণ দাবি: বিটিভি বাঁচাও ও সমমনা জোটের কঠোর হুঁশিয়ারি মেধা বনাম আমলাতন্ত্র: বিটিভির ডিজির ক্ষমতা খর্বের নেপথ্যে কী? শিল্পকলা একাডেমিতে মিউজিক্যাল চেয়ার: রেজাউদ্দিন স্টালিনের মেয়াদ শেষ, সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন “সাংবাদিকরা বিত্তবান হতে চায় না, চায় নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন”— জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে সাধুবাদ, পার্থর দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষা শিলংয়ে জন্ম, চট্টগ্রামের সঙ্গে পারিবারিক যোগ—যে ব্রিটিশ উদ্ভাবক বদলে দিলেন টাকা তোলার ইতিহাস! ​বিটিভির জন্য বড় দুঃসংবাদ: হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ মনিরুলই হতে চলেছেন প্রধান প্রকৌশলী!
Notice :

বিটিভি: ​চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া বিটিভির আধুনিকায়ন কেবলই অর্থের অপচয় 

নিজস্ব প্রতিবেদক || আমার টেলিভিশন || ঢাকা

 

“প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা ও শীর্ষ নেতৃত্বের ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও গভীর শেকড়ের অশুভ সিন্ডিকেট ভাঙাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ”

​বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কেবল একটি রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম নয়; বরং এটি এ দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক তোষামোদ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক প্রকট প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়ন, সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে যে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রচার বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই মৌলিক বাস্তবতাটি হলো—প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা কাঠামোগত পচন ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট নির্মূল না করে কেবল শীর্ষপর্যায়ে রদবদল আনলে কোনো সংস্কারেই ইতিবাচক ও স্থায়ী ফল বয়ে আনা সম্ভব নয়।

​শীর্ষ নেতৃত্ব বনাম গভীর শেকড়ের সিন্ডিকেট:

​বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) শীর্ষ পর্যায়ের অসততা, নজিরবিহীন দলীয়করণ এবং যোগ্য নেতৃত্বের চরম অভাবই ছিল প্রতিষ্ঠানটির ধসে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বিটিভিকে পুনরুজ্জীবিত ও আধুনিকীকরণের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক। বিশেষ করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিটিভির সার্বিক পরিবর্তনের বিষয়ে যথেষ্ট সচেষ্ট থাকায় প্রতিষ্ঠানটিতে গতিশীলতা, পেশাদারত্ব ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সচিব পদমর্যাদায় একজন অত্যন্ত দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়োগ দিয়েছেন।

​তবে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞদের মতে, শীর্ষ নেতৃত্বের এই ইতিবাচক পরিবর্তন ও সরকারের সর্বাত্মক সদিচ্ছা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানের গভীরে গেঁথে থাকা অশুভ সিন্ডিকেট বলয় অক্ষত থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

​সরকারের এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আন্তরিকতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের যোগ্যতা নিঃসন্দেহে এক আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ। তবে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ এবং বিটিভি নিয়ে চিন্তাশীল অংশীজনদের মতে, কেবল শীর্ষ পদে একজন দক্ষ ও সৎ ডিজি বসানোই প্রতিষ্ঠানটির সব সমস্যার জাদুকরী সমাধান নয়। কারণ, বিগত দেড় দশকে প্রতিষ্ঠানের আড়াই হাজার জনবলের ভেতরে যে ৩০ থেকে ৪০ জনের মূল দুর্নীতিবাজ চক্র এবং ১০টি উপ-সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাব গেড়ে বসেছে, তা আজও অটুট।

​বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীতের এই জঞ্জাল ও প্রায় ৮০% ভোল পাল্টানো সুবিধাবাদী শ্রেণিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে জবাবদিহিতা ও বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত সচিব পদমর্যাদার ডিজির সংস্কারের যত ভালো সদিচ্ছাই থাক না কেন, তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।কাঠামোগত এই গভীর পচন দূর না হলে বিশ্বমানের বিটিভি গড়ার সকল চেষ্টা কেবল প্রশাসনিক জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের চক্রান্তেই ঢাকা পড়ে থাকবে।

​সুবিধাবাদী আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক ভোলবদল:

​প্রতিষ্ঠানের মোট জনবলের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশজুড়ে রয়েছে এক ধরনের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, যাদের প্রধান সক্ষমতা নীতিগত কাজের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ মেনে নিজেদের রঙ পরিবর্তন করা। বিগত ফ্যাসিবাদী কিংবা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অধীনে এরা পূর্ণ সুবিধা ভোগ করেছে এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষায় দ্রুত ভোল পাল্টিয়ে নিয়েছে। এই বিশাল ‘সুবিধাবাদী অনু অনুসারী’ শ্রেণি নতুন কোনো সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে ভেতর থেকে অকার্যকর করে দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরব কিন্তু কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

​আধুনিকায়নের পূর্বশর্ত- শাস্তিমূলক জবাবদিহিতা:

​প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন কিংবা কন্টেন্টের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা কেবল দামি যন্ত্রপাতি কেনার বিষয় নয়; এটি মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পজিটিভ রূপান্তর। যে প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিচার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনি কূটকৌশল ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে থমকে থাকে; যেখানে চিহ্নিত অপরাধীরা থেকে যায় অধরা এবং অতীত অপকর্মের কোনো হিসাব চাওয়া হয় না—সেখানে আধুনিকায়নের নামে শত শত কোটি টাকা ঢালা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থের নির্লজ্জ অপচয়। বিটিভিকে একটি গণমুখী ও পেশাদার গণমাধ্যমে রূপান্তর করতে হলে যেকোনো সংস্কারের প্রথম ও প্রধান ধাপ হতে হবে নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক অডিট সম্পাদন এবং চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

​২৫০০ জনবলের প্রশাসনিক ব্যবচ্ছেদ ও কাঠামোগত সমতা:

​বিটিভির ২৫০০ জনবলের পাহাড়সম অনু উৎপাদনশীল ভার লাঘবে আধুনিক বৈশ্বিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর আদলে একটি সুষম ও পেশাদার জনবল কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে তিন ধাপের একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করার বিষয়ে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন:

​১. আইনি ব্যবস্থা ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: দুদক ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারিতে থাকা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা এবং তাদের জ্ঞাতআয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকারের অনুকূলে জমা করা।

​২. সুবিধাবাদী গোষ্ঠী অপসারণ: বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসর ও অনৈতিক সুবিধাভোগীদের দ্রুত চিহ্নিত করে প্রশাসনিকভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো।

​৩. কাঠামোগত পুনর্গঠন (ডাউনসাইজিং): অদক্ষ ও অপ্রয়োজনীয় জনবলকে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’-এর মাধ্যমে সম্মানজনক বিদায় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক বোঝা কমিয়ে আনা।

​পরবর্তী ধাপে শূন্যস্থান পূরণে আন্তর্জাতিক মানের চুক্তিভিত্তিক দক্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারের পেশাদার, মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নতুন একটি টিম গঠন করা; যা বিটিভিকে একটি গতিশীল ও বিশ্বমানের সম্প্রচার কেন্দ্রে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।

​উপসংহার: 

​পচা কাঠামোর ওপর আধুনিকতার ঝলমলে প্রলেপ দিয়ে কখনোই একটি স্থায়ী ও বিশ্বমানের গণমাধ্যম গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিটিভিকে জনমুখী ও পেশাদার সম্প্রচার কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হলে শীর্ষপদের সৌন্দর্যবর্ধন বন্ধ করে আগে ওই ৩০-৪০ জন মূল কারিগরসহ পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি অস্ত্রোপচার চালাতে হবে। অন্যথায়, ‘বিটিভি সংস্কার’ বিষয়টি কেবল একটি চমৎকার রাজনৈতিক স্লোগান এবং অর্থহীন প্রশাসনিক মহড়া হিসেবেই ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে।