
বিটিভি: চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং একটি মৃত্যু
“বিটিভি কর্মীর মৃত্যু, তিন মাসের বেতন বকেয়ার প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কি লাল ফিতার ফাঁদে?”
বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের চুক্তিভিত্তিক কর্মী শহীদুল ইসলাম আর নেই। ২৫ সেপ্টেম্বর নাইট ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার পর তিনি অসুস্থ বোধ করেন। ২৬ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ২৭ সেপ্টেম্বর অসুস্থতার কারণে অফিসে যেতে পারবেন না—এ কথা কর্তৃপক্ষকে জানান। খবর পেয়ে সেদিন সহকর্মীরা তাঁর বাসায় গিয়ে দুপুরের দিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। অতঃপর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শহীদুলের আকস্মিক মৃত্যুতে সহকর্মীদের মাঝে নেমে এসেছে শোক। একই সঙ্গে সামনে এসেছে বিটিভির চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বেতন, চিকিৎসা, জীবন-জীবিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিশেষ করে তাঁর বেতন বকেয়া থাকার তথ্য সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—অসুস্থতার সময় একজন অনিশ্চিত আয়ের কর্মী ও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কোথায়? সহকর্মীদের দাবি, শহীদুল ইসলামসহ চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের কারও কারও কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এমন অভিযোগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে—একজন কর্মী মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে পরিবার চালাবেন কীভাবে? চিকিৎসা চলবে কিভাবে?
এগুলো এখন আর শুধু মানবিক প্রশ্ন নয়; এগুলো প্রশাসনিক জবাবদিহিতারও প্রশ্ন।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ—প্রয়োজন, নাকি স্থায়ী ব্যবস্থার বিকল্প?
বিটিভির মতো ২৪ ঘণ্টার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে বিশেষায়িত ও কারিগরি কাজের জন্য চুক্তিভিত্তিক জনবল রাখার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অস্থায়ী ব্যবস্থা যদি বছরের পর বছর স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়, তাহলে সেটিকে আর অস্থায়ী বলা যায় কি?
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ১৯৯২ সালের ‘বাংলাদেশ টেলিভিশনের (গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা’ এখনো নীতিমালা হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে শিল্পী ও কলাকুশলী তালিকাভুক্তি, অডিশন, গ্রেডেশন ও পুনর্মূল্যায়ন নীতিমালাও অনুমোদিত হয়েছে।
অর্থাৎ চুক্তি, তালিকাভুক্তি ও বিশেষায়িত জনবলের জন্য নীতিগত কাঠামো রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটি অন্য জায়গায়— এই জনবল ব্যবস্থাপনা কি সময়মতো বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিশ্চয়তা দিতে পারছে?
আইন আছে, কিন্তু কর্মীর বেতন কোথায়?
বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০১-এর মাধ্যমে বিটিভিকে একটি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে। আইনের কার্যাবলির মধ্যে বিটিভির কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের পাশাপাশি সংবাদ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মান উন্নয়নের দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত।
তাহলে কর্মরত একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মীর নিয়মিত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা কি সেই প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে?
যদি সত্যিই কোনো কর্মীর তিন মাসের বেতন বকেয়া থাকে, তাহলে বেতন আটকে থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ কী?
বাজেট সংকট? অর্থ ছাড়ে বিলম্ব? চুক্তি নবায়নের জটিলতা? বিল প্রস্তুত বা অনুমোদনের সমস্যা?
অডিট আপত্তি? নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নথিভিত্তিকভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
একদিকে চুক্তিভিত্তিক জনবল, অন্যদিকে ভারী প্রশাসন
বিটিভিতে দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিকভিত্তিক জনবল ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। বিটিভির নিজস্ব ওয়েবসাইটের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মী তালিকাতেও চুক্তিভিত্তিক কর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বার্তা বিভাগে অফিস সহায়ক এবং আইটি শাখায় একাধিক কম্পিউটার ট্রাবলশুটারকে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে বোঝা যায়, চুক্তিভিত্তিক জনবল বিটিভির দৈনন্দিন কার্যক্রমের একটি বাস্তব অংশ।
কিন্তু অনুসন্ধানের বিষয় হলো—এই জনবল ব্যবস্থাপনার জন্য কি সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা রয়েছে?
কারণ একজন কর্মীকে প্রয়োজনের সময় নিয়োগ করা এক বিষয়; আর বছরের পর বছর একই ধরনের কাজ করিয়ে তাকে অনিশ্চিত অবস্থায় রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিটিভির অর্থনীতি: প্রশ্ন আরও বড়:
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, বিটিভির বার্ষিক বাজেট ৩২০–৩২৫ কোটি টাকা, বিপরীতে আয় ১৫–১৬ কোটি টাকা। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ভর্তুকিনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন এবং জনগণের অর্থের কার্যকর ব্যবহারের প্রশ্ন তোলেন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১১ মাসে বিটিভির আয় ৮ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং ব্যয় ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা—এমন হিসাবও প্রকাশিত হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—
এত বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, এত অবকাঠামো, এত জনবল এবং এত সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও নিজস্ব আয় ও দর্শক ধরে রাখার সক্ষমতা কেন এত দুর্বল?
‘দক্ষ লোক নেই, তাই অবসরপ্রাপ্তদেরই রাখতে হয়’—এই যুক্তি কতটা টেকসই?
বিটিভির পক্ষে একটি প্রচলিত যুক্তি হতে পারে—সম্প্রচার একটি বিশেষায়িত কাজ; অভিজ্ঞ কর্মী ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে মানসম্মত সম্প্রচার সম্ভব নয়। যুক্তিটি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কিন্তু তার পরেই আরেকটি প্রশ্ন আসে—
তাহলে নতুন দক্ষ জনবল তৈরির দায়িত্ব কার?
যদি বছরের পর বছর একই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক রেখে কাজ চালাতে হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা কোথায়?
একটি আধুনিক সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের HR strategy-তে থাকা উচিত—
নিয়মিত নিয়োগ ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন; প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ; succession planning; দক্ষতা মূল্যায়ন; কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি; তরুণ জনবল তৈরির পরিকল্পনা; অবসরপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান হস্তান্তরের ব্যবস্থা।
অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞদের প্রয়োজন হলে mentor, trainer বা consultant হিসেবে সীমিত মেয়াদে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু তাঁদের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া কোনো আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার লক্ষণ নয়।
বেসরকারি চ্যানেল পারলে বিটিভি কেন পারবে না?
বাংলাদেশে বেসরকারি টেলিভিশনগুলো সীমিত সম্পদ নিয়েও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে আছে। তাদের বড় শক্তি হচ্ছে দ্রুত সিদ্ধান্ত, চাহিদাভিত্তিক জনবল, প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহার এবং দর্শকের রুচি অনুযায়ী কনটেন্ট পরিবর্তন।
বিটিভির রয়েছে বিশাল ঐতিহ্য, নিজস্ব স্টুডিও, আর্কাইভ, প্রশিক্ষিত কর্মী, দেশব্যাপী সম্প্রচার অবকাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সুবিধা। তারপরও যদি দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতা হারাতে থাকে, তাহলে সমস্যাটি শুধু অর্থের নয়—ব্যবস্থাপনারও।
‘জিরো দর্শক’—নাকি দর্শক সংকটের বাস্তবতা?
তবে ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিটিভির দর্শক হারানো, বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের কথা উঠে এসেছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের ব্যবধানের পাশাপাশি বিটিভির দর্শকসংকটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটির বর্তমান audience share কত? গত পাঁচ বছরে তা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে? কোন অনুষ্ঠান কতজন দর্শক দেখেন? বিজ্ঞাপনদাতারা কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? এসবের উত্তর প্রকাশ্যে আসা দরকার।
শহীদুল ইসলামের মৃত্যু তাই একটি ‘কেস’ নয়—একটি সতর্ক সংকেত।
নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় সুযোগ:
কাজী জেসিনের এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে এখন বিটিভির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই যদি আধুনিক, দক্ষ, জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর সম্প্রচারমাধ্যমে পরিণত হতে চায়, সে ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে হবে ব্যবস্থাপনায়। পরিবর্তন করতে হবে মানবসম্পদ নীতিতে।
পরিবর্তন করতে হবে কনটেন্ট পরিকল্পনায়। পরিবর্তন করতে হবে আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। আর সবচেয়ে আগে নিশ্চিত করতে হবে—যে মানুষগুলো বিটিভির সম্প্রচার চালু রাখেন, তাঁদের প্রাপ্য যেন মাসের পর মাস অনিশ্চয়তায় না থাকে।
কারণ রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন নয়, স্টুডিও নয়, ক্যামেরা নয়—মানুষ।
শেষ কথা:
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত প্রশাসনিক জটিলতা, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং সময়ের সঙ্গে তাল না-মেলা আইন ও নীতিমালার ভারে বাংলাদেশ টেলিভিশন আজ যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তা থেকে উত্তরণ নিঃসন্দেহে সময়সাপেক্ষ। তবে পরিবর্তনের প্রত্যাশার জায়গাটিও তৈরি হয়েছে। মাত্র এক-দুই মাস আগে সচিব পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ফলে রাতারাতি পরিবর্তনের প্রত্যাশা না করে প্রয়োজন কাঠামোগত ও ধারাবাহিক সংস্কার—যোগ্য জনবল, সময়মতো বেতন, দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি, আধুনিক প্রযুক্তি, দর্শকনির্ভর অনুষ্ঠান ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারের আধুনিক, বিশ্বমানের ও জনবান্ধব বিটিভি গড়ে তোলার প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হলে সময়ের ব্যবধানে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন পর্দায় যেমন দেখা যাবে, তেমনি অনুভূত হবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিবেশেও। শহীদুল ইসলামের মৃত্যু তাই শুধু একটি বেদনাবিধুর সমাপ্তি নয়—একটি মানবিক, দক্ষ ও আধুনিক বিটিভি গড়ে তোলার প্রত্যাশারও এক নীরব স্মারক।
