October 24, 2026, 3:37 am
শিরোনাম :
ফেসিয়াল প্লাস্টিক সার্জারি: চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মেলবন্ধন বিটিভি: ​চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া বিটিভির আধুনিকায়ন কেবলই অর্থের অপচয়  শিশুর হাসিতে ফিরুক আত্মবিশ্বাস: প্লাস্টিক সার্জারিতে নিখুঁত রূপ পাচ্ছে বিকৃত ক্ষতচিহ্ বিটিভি কর্মীর মৃত্যু, তিন মাসের বেতন বকেয়ার প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কি লাল ফিতার ফাঁদে? তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার অপসারণ দাবি: বিটিভি বাঁচাও ও সমমনা জোটের কঠোর হুঁশিয়ারি মেধা বনাম আমলাতন্ত্র: বিটিভির ডিজির ক্ষমতা খর্বের নেপথ্যে কী? শিল্পকলা একাডেমিতে মিউজিক্যাল চেয়ার: রেজাউদ্দিন স্টালিনের মেয়াদ শেষ, সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন “সাংবাদিকরা বিত্তবান হতে চায় না, চায় নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন”— জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে সাধুবাদ, পার্থর দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষা শিলংয়ে জন্ম, চট্টগ্রামের সঙ্গে পারিবারিক যোগ—যে ব্রিটিশ উদ্ভাবক বদলে দিলেন টাকা তোলার ইতিহাস! ​বিটিভির জন্য বড় দুঃসংবাদ: হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ মনিরুলই হতে চলেছেন প্রধান প্রকৌশলী!
Notice :

রাজশাহীর স্মৃতিচিহ্ন ‘ঢোপকল’: এক অতুলনীয় ঐতিহ্যের জলছাপ

লাইবা আসিফ || জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী || আমার টেলিভিশন

রাজশাহী—বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী নগরী, যার প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি স্থাপত্যের গায়ে ইতিহাসের ছোঁয়া লেগে আছে। ঠিক তেমনি এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু ঢোপকল—যা কেবল পানির উৎস ছিল না, বরং একসময়ের নগর-পরিকল্পনার নিপুণ শিল্প ও জনকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল নিদর্শন।

মহারাণী হেমন্তকুমারীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা

১৯৩৭ সালের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে, মহারাণী হেমন্তকুমারীর উদার অনুদান ও উদ্যোগে রাজশাহীতে গড়ে ওঠে ‘মহারাণী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। রাজশাহী পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় ডি. এন. দাশগুপ্ত ও রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সূচনা হয়। তখন শহরে বিশুদ্ধ পানির ভয়াবহ সংকট ছিল। কলেরা, আমাশয়, পেটের অসুখে বহু প্রাণ হারায়। এই নির্মম বাস্তবতায় নগরবাসীর জন্য নির্মিত হয় শতাধিক ঢোপকল—এক অনন্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

কীর্তির কাঠামো: ঢোপকলের নির্মাণশৈলী

প্রত্যেকটি ঢোপকল ছিল প্রায় ১২ ফুট উঁচু এবং ৪ ফুট ব্যাসবিশিষ্ট। দৃঢ় নির্মাণশৈলী ও সুনিপুণ কারিগরিতে তৈরি এ ঢোপগুলোর গায়ে ঢেউখেলানো প্লাস্টারের সৌন্দর্য যেন শিল্পের সঙ্গে কার্যকারিতার মেলবন্ধন ঘটায়। টিনের ছাঁচে সিমেন্ট ও ইটের খোয়া ঢেলে এই কলগুলো ঢালাই করা হতো। এর স্থায়িত্ব ছিল এতটাই শক্তিশালী যে বহু বছর পরও কিছু ঢোপকল দৃশ্যমান ও অক্ষত রয়ে গেছে।

সুপেয় জলের ধারাবাহিকতা

প্রথমে বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে পাথরকুঁচির ফিল্টারে পানি ছেঁকে আয়রন ও ক্ষার অপসারণ করা হতো। এরপর মোটা পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো শহরের বিভিন্ন মোড়ে স্থাপিত ঢোপকলগুলোতে। প্রতিটি ঢোপকলের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৭০ গ্যালন। বালি ও পাথরের রাফিং ফিল্টারের কারণে পানি পরিশোধিত ও তুলনামূলক ঠান্ডা থাকতো, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও গুণমান পরীক্ষা

দুই মাস অন্তর প্রতিটি ঢোপকল পরিষ্কার করা হতো। খুলে ফেলা হতো ঢাকনা, ভিতরে মানুষ নেমে ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি দিয়ে ভিতরের অংশ ধুয়ে ফেলতো। পানির মান বজায় রাখতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হতো।

আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী

কালের পরিক্রমায় আধুনিক পাইপলাইনের বিস্তারে এই ঢোপকলগুলোর কার্যকারিতা হারিয়ে গেছে। রাজশাহীর ব্যস্ত শহরে আজ কেবল ২-১টি ঢোপকল টিকে আছে—যেমন কুমারপাড়ায় অবস্থিত ঢোপকলটি। সময়ের স্রোতে বিলুপ্তপ্রায় হলেও এগুলো রাজশাহীর সংস্কৃতি ও নাগরিক সচেতনতার এক অমূল্য চিহ্ন।

পরিশিষ্ট

ঢোপকল শুধু একটি জলাধার নয়—এটি এক সময়ের জনদরদি পরিকল্পনার প্রতীক। আজ যখন আমরা উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার কথা বলি, তখন আমাদের উচিত এই ঐতিহাসিক প্রকল্পগুলোকে সংরক্ষণ করা, নব প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। ঢোপকল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কীভাবে একটি সমাজ তার নাগরিকদের জন্য সুস্থ, নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে পারে।

রাজশাহীর ঢোপকল—অতীতের জলছবিতে আঁকা এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।