
“যেখানে ‘মেধা’র চেয়ে ‘দালালি’র বাজারদর বেশি, আর ৪০০ কোটির ভর্তুকিতে চলে দুর্নীতিবাজদের বিলাসী ‘মাস্টারব্যাচ”
একসময়কার বিটিভি মানেই ছিল এক সম্মোহনী জাদুঘর, যেখানে রিকশাচালক থেকে শুরু করে হালের আমলা—সবাই রিমোট হাতে ‘হিপনোটিজ্ড’ হয়ে বসে থাকত! রাত ৮টা বাজলেই মনে হতো যেন কোনো ধর্মীয় রীতির মতো টিভির সামনে হাজির হতে হবে; বাড়ির কাজের বুয়া থেকে শুরু করে কামার-কুমার-জেলে পর্যন্ত—সবার রুটিন নির্ধারিত হতো বিটিভির ঘড়ির কাঁটা ধরে। এখনকার মতো তখন ‘ডিশ বা ব্রডব্যান্ড’ নামক কোনো ডিজিটাল মরীচিকার বালাই ছিল না, ছিল কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশনের একচ্ছত্র আধিপত্য। নাটকের কোনো চরিত্রের ফাঁ/সি হবে কি হবে না—তা নিয়ে রাজপথে মিছিল, নাট্যকারকে নিয়ে হাহাকার আর সরকারের টেবিলে স্মারকলিপি দেওয়ার সেই সোনালী দিনগুলো এখন রূপকথার গল্পের মতো মনে হয়। তখন টপ টু বটম সবাই ছিল সৃজনশীলতার বরপুত্র—যাদের হাতের ছোঁয়ায় একটি বিজ্ঞাপন প্রচার হওয়া মানেই ছিল পণ্যের অঢেল মুনাফা আর বাজারে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। আর আজ? সেই প্রাণবন্ত বিটিভি যেন জ্যান্ত এক ‘মমি’—যার ভেতর কেবল দুর্গন্ধময় দুর্নীতি আর অযোগ্যতার পচন ধরেছে।
একসময়ের সৃজনশীলতার স্বর্গ এখন পরিণত হয়েছে অদক্ষ আমলা আর তোষামুদী শিল্পীদের ব্যক্তিগত ‘লুটপাটের আখড়ায়’। যাদের সৃজনশীলতায় এই টেলিভিশন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, আজ তাদেরই রাজপথে অন্নসংস্থানের জন্য আর্তনাদ করতে হচ্ছে—অথচ বিটিভির গদিতে বসে থাকা দুর্নীতিবাজরা কানে টিস্যু আর চোখে সানগ্লাস পরে দিব্যি ‘রাজকীয়’ তামাশা উপভোগ করছে!
বর্তমান বিটিভি যেন এক অদ্ভুত গবেষণাগার! এখানে ‘রুলস অফ বিজনেস’ বা চাকরির বিধিবিধানকে আগেই কবর দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন চলছে—‘কে কতটা দুর্নীতি করতে পারে’—তার অসম প্রতিযোগিতা। মন্ত্রী-সচিবদের তোষামুদী করে যারা টেলিভিশনের চেয়ার দখল করে আছেন, তারা বিটিভিকে আক্ষরিক অর্থেই বানিয়েছেন নিজেদের পকেট ভারী করার ‘সেফ হোম’। অন্যদিকে, সরকারি ৪০০-৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকির টাকা কোথায় যায়? উত্তরটি সহজ—দুর্নীতিবাজদের পেটে। আয় নেই, ব্যয় সীমাহীন—অথচ তাদের চোখে সানগ্লাস আর কানে টিস্যু পেপার! তারা দাবি করেন, তারা নাকি বিটিভি চালাচ্ছেন, অথচ আসলে তারা চালাচ্ছেন এক বিশাল ‘লুটপাটের সিন্ডিকেট’।
এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা রুখে দাঁড়িয়েছেন—বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও শিল্পী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবং বাংলাদেশ সৃজনশীল শিল্প সংস্কৃতি পরিষদ—তাদের লড়াই আজ কেবল আন্দোলন নয়, এ যেন এক ‘অগ্নিপরীক্ষা’। বিশেষ করে পলাশ কুমার সাও, যিনি প্রথম এই আন্দোলনের বীজ বপন করেছিলেন, এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক খালিদ খলিল, যিনি শত হামলা-মামলা ও প্রাণনাশের হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কলম চালিয়ে যাচ্ছেন—তারা আজ প্রমাণ করেছেন, মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হলে ‘আয়নার’ সামনে দাঁড়াতে হয়। তাদের এই লড়াইয়ে সমর্থন দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রবাদপ্রতিম শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী, শেখ সাদী খান, লীনু বিল্লাহ, মুজিব পরদেশী, শাহিন সামাদ ও সুজিত মোস্তফা প্রমূখ এবং আন্দোলনের বর্তমান আহ্বায়ক হাসিম উদ্দিন।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলি—চোখে কালো সানগ্লাস খুলে ৫০০ পাওয়ারের চশমা পরুন, নতুবা আপনাদের হাতে থাকা দামি কলম কেড়ে নিয়ে ‘তিন টাকার কলম’ ধরিয়ে দেওয়া হবে, যা দিয়ে আপনারা নিজেদের কুকর্মের ইস্তফা লিখবেন। এই আন্দোলন আর থামার নয়; বিটিভিকে দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে মুক্ত করতে এই শিল্পী সমাজ এখন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। বিটিভি বাঁচাও, দুর্নীতিবাজ আমলা-কামলা তাড়াও—এই স্লোগান এখন সময়ের দাবি, আর যারা এখনো কানে টিস্যু গুজে বসে আছেন, তাদের সময় ফুরিয়ে এসেছে। ইতিহাস কিন্তু কাউকে ক্ষমা করে না!