October 25, 2026, 6:41 am
শিরোনাম :
ফেসিয়াল প্লাস্টিক সার্জারি: চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মেলবন্ধন বিটিভি: ​চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া বিটিভির আধুনিকায়ন কেবলই অর্থের অপচয়  শিশুর হাসিতে ফিরুক আত্মবিশ্বাস: প্লাস্টিক সার্জারিতে নিখুঁত রূপ পাচ্ছে বিকৃত ক্ষতচিহ্ বিটিভি কর্মীর মৃত্যু, তিন মাসের বেতন বকেয়ার প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কি লাল ফিতার ফাঁদে? তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার অপসারণ দাবি: বিটিভি বাঁচাও ও সমমনা জোটের কঠোর হুঁশিয়ারি মেধা বনাম আমলাতন্ত্র: বিটিভির ডিজির ক্ষমতা খর্বের নেপথ্যে কী? শিল্পকলা একাডেমিতে মিউজিক্যাল চেয়ার: রেজাউদ্দিন স্টালিনের মেয়াদ শেষ, সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন “সাংবাদিকরা বিত্তবান হতে চায় না, চায় নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন”— জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে সাধুবাদ, পার্থর দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষা শিলংয়ে জন্ম, চট্টগ্রামের সঙ্গে পারিবারিক যোগ—যে ব্রিটিশ উদ্ভাবক বদলে দিলেন টাকা তোলার ইতিহাস! ​বিটিভির জন্য বড় দুঃসংবাদ: হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ মনিরুলই হতে চলেছেন প্রধান প্রকৌশলী!
Notice :

“সেটেলার” ও “আদিবাসী” দুই শব্দে বিতর্ক পার্বত্য চট্টগ্রাম—-কামাল পারভেজ

কামাল পারভেজ: লেখক, গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিসস্ট 

পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত দুটি শব্দ হলো—‘সেটেলার’ ও ‘আদিবাসী’। শব্দ দুটি শুধু পরিচয়ের ভাষাগত প্রকাশ নয়; বরং এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে এই দুই শব্দের ব্যবহারকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায়ই বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত পাহাড়ি ভূখণ্ড নিয়ে গড়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। আন্তর্জাতিক সীমানায় এটি ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভৌগলিকভাবে সংযুক্ত। প্রায় ১৩ হাজার ২৯৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদ, বনজ সম্পদ এবং কৃষিজ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বিশ্লেষকের মতে, দেশের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশের জোগান আসে এই অঞ্চল থেকে। সীমান্ত সড়কের দৈর্ঘ্য নিয়েও বিভিন্ন পরিসংখ্যানে ভিন্নতা দেখা যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সীমান্ত সড়ক ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার হলেও, বিভিন্ন গবেষণায় তা ৭৩৫ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পার্বত্য চট্টগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে এই অঞ্চলের ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বহু পুরনো। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা কৌশলগত পরিকল্পনা সক্রিয় রয়েছে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে বিভাজন ও শাসননীতির যে কাঠামো গড়ে ওঠে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো সমাজ ও রাজনীতিতে বিদ্যমান।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা বাংলার শাসনক্ষমতা দখল করে এবং ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে তাদের প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও তারা খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সার্কেল ব্যবস্থা চালু করে। সেই সময়ে স্থানীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতার কাঠামো নতুনভাবে বিন্যস্ত হয়। লেখকের মতে, ঔপনিবেশিক শক্তি বিভাজনের রাজনীতি ব্যবহার করে বাংলা অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পরও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও সীমান্ত, জাতিগত পরিচয় ও ভূমির প্রশ্ন নানা সময়ে আলোচনায় এসেছে। লেখকের দাবি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের সীমান্ত নির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশের কিছু ভূখণ্ড ভারতীয় সীমানায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে বিতর্ক রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো পরিচয়ের প্রশ্ন। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ এবং পরে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবি সামনে আসে। আন্তর্জাতিকভাবে “আদিবাসী” শব্দটি সাধারণত সেইসব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যারা কোনো ভূখণ্ডের প্রাচীন ও স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিদ্যমান।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ম্রোসহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের “আদিবাসী” হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তাদের দাবি, তারা এই অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রয়োজন। তবে এ বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। লেখকের মতে, এসব জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপনের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অনেকের ধারণা তারা বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে এসে পার্বত্য এলাকায় বসতি স্থাপন করেন।

অন্যদিকে “সেটেলার” শব্দটি ব্যবহৃত হয় মূলত সেইসব বাঙালি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, যারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রের পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে এটাও সত্য যে, বহু বাঙালি পরিবার দীর্ঘ একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একাংশ তাদের “সেটেলার” হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, অনেক বাঙালি বাসিন্দা এই শব্দটিকে বৈষম্যমূলক ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বলে মনে করেন। তাদের যুক্তি, তারা বাংলাদেশের নাগরিক এবং সমঅধিকারের দাবিদার।

পার্বত্যবাসীদের একটি অংশের মধ্যে আরও একটি প্রশ্ন প্রচলিত রয়েছে—পাহাড়ি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আদি উৎস কোথায়। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের একটি অংশ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে এসে বসতি স্থাপন করেছে বলে ধারণা প্রচলিত আছে। শান্তিচুক্তির পর গঠিত শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রসঙ্গ টেনে লেখক দাবি করেন, এই বিষয়টিও বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “সেটেলার” ও “আদিবাসী” শব্দ নিয়ে বিতর্কের পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অমীমাংসিত প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। কেবল পরিভাষা নিয়ে সংঘাতে না গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, সমঅধিকার এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতির স্বার্থে প্রয়োজন সংলাপ, সহনশীলতা এবং এমন ভাষার ব্যবহার, যা বিভাজনের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়াকে শক্তিশালী করে। শব্দের সংঘাত নয়, বরং সমাধানের পথই হতে পারে টেকসই শান্তির ভিত্তি।

কামাল পারভেজ: লেখক, গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিসস্ট