
“জন শেফার্ড-ব্যারনের হাত ধরে ১৯৬৭ সালে শুরু ATM যুগ; স্ত্রীর পরামর্শেই ছয় নয়, চার সংখ্যার PIN”
শিলংয়ে জন্ম, চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগ—ATM বিপ্লবের নেপথ্যের মানুষ জন শেফার্ড-ব্যারন:
আজ ব্যাংকে না গিয়েই কয়েক মিনিটে টাকা তোলা আমাদের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু একসময় ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে নিজের টাকা পাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না। সেই সমস্যার সমাধানের ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় এমন একটি যন্ত্র, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেহারা বদলে দেয়—ATM বা Automated Teller Machine।
এই বিপ্লবের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে নামটি জড়িয়ে আছে, তিনি John Adrian Shepherd-Barron। তবে তাঁকে সরাসরি ‘ভারতীয় ATM উদ্ভাবক’ বলা ঐতিহাসিকভাবে পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি ২৩ জুন ১৯২৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের শিলংয়ে, বর্তমান ভারতের মেঘালয়ে, ব্রিটিশ বাবা-মায়ের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা Wilfrid Shepherd-Barron ছিলেন চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার্সের Chief Engineer। পরবর্তীকালে তিনি ব্রিটিশ প্রকৌশল জগতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। জন শেফার্ড-ব্যারন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক এবং স্কটিশ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ব্যাংক বন্ধ—আর সেখান থেকেই ভাবনার শুরু:
১৯৬৫ সালের দিকে একদিন ব্যাংকের নির্ধারিত সময়ের মাত্র কয়েক মিনিট পরে পৌঁছে নিজের টাকা তুলতে না পারার অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি ভাবলেন—চকলেট যদি একটি ভেন্ডিং মেশিন থেকে যেকোনো সময় বের করা যায়, তাহলে টাকা কেন নয়?
এই ধারণাই তাঁকে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় নগদ বিতরণ যন্ত্র তৈরির দিকে নিয়ে যায়, যা ব্যাংকের কাউন্টার বন্ধ থাকার পরও গ্রাহককে টাকা দিতে পারবে। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, চকলেট ভেন্ডিং মেশিন থেকেই তিনি ধারণাটি পেয়েছিলেন।
১৯৬৭: ইতিহাসের প্রথম কার্যকর Cash Machine:
জন শেফার্ড-ব্যারনের নেতৃত্বে De La Rue Instruments ও Barclays-এর সহযোগিতায় তৈরি হয় De La Rue Automatic Cash System (DACS)। ১৯৬৭ সালের ২৭ জুন লন্ডনের Enfield-এ Barclays-এর শাখায় যন্ত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। ঐতিহাসিক স্থানটি আজও বিশ্বের প্রথম কার্যকর ATM/cash machine স্থাপনের স্থান হিসেবে স্বীকৃত।
উদ্বোধনী লেনদেনটি করেছিলেন ব্রিটিশ অভিনেতা Reg Varney। তখনকার মেশিন থেকে একবারে সর্বোচ্চ £10 পাওয়া যেত।
তবে এটি আজকের ATM-এর মতো প্লাস্টিক কার্ড ঢুকিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি টাকা তোলার ব্যবস্থা ছিল না। গ্রাহককে আগে ব্যাংক থেকে বিশেষ কাগজের ভাউচার নিতে হতো। সেই ভাউচার মেশিনে প্রবেশ করানোর পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নগদ অর্থ দেওয়া হতো। মেশিনের ভাউচারভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় Carbon-14-যুক্ত বিশেষ কাগজও ব্যবহার করা হয়েছিল।
ছয় সংখ্যার PIN থেকে চার সংখ্যায়:
আজকের ATM ব্যবহারের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো চার সংখ্যার PIN। এই চার সংখ্যার PIN জনপ্রিয় হওয়ার পেছনেও শেফার্ড-ব্যারনের একটি মজার গল্প রয়েছে।
তিনি প্রথমে ছয় সংখ্যার PIN ব্যবহারের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী Caroline মনে করেছিলেন, ছয়টি সংখ্যা মনে রাখা অনেকের জন্য কঠিন হবে। তাঁর পরামর্শে PIN চার সংখ্যায় নামিয়ে আনা হয়। শেফার্ড-ব্যারনের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রীর মনে রাখার সুবিধার কারণেই চার সংখ্যার PIN ব্যবহারের ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এরপর বদলে গেল ATM-এর প্রযুক্তি:
১৯৬৭ সালের DACS ছিল ATM ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা, কিন্তু সেটি আধুনিক অনলাইন ATM-এর সমতুল্য ছিল না। পরবর্তী কয়েক বছরে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কার্ডভিত্তিক এবং পরে magnetic-stripe ও অনলাইন ATM প্রযুক্তি উন্নত করে। ১৯৭২ সালে Lloyds-এর Cashpoint ব্যবস্থা অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত ATM ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক রূপ দেয়।
অর্থাৎ, আধুনিক ATM একক কোনো ব্যক্তির একক আবিষ্কার নয়; বরং কয়েকজন উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক উদ্ভাবনের ফল। তবে ১৯৬৭ সালে বিশ্বের প্রথম কার্যকর cash-dispensing machine চালুর কৃতিত্ব জন শেফার্ড-ব্যারনের নেতৃত্বাধীন দলকে ব্যাপকভাবে দেওয়া হয়।
ভারতে ATM আসে ১৯৮৭ সালে:
ভারতে ATM ব্যবস্থার সূচনা হয় আরও দুই দশক পরে। ১৯৮৭ সালে HSBC মুম্বাইয়ে ভারতের প্রথম ATM স্থাপন করে—HSBC-এর নিজস্ব ইতিহাসেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
৮৪ বছর বয়সে অবসান:
জন শেফার্ড-ব্যারন ১৫ মে ২০১০ সালে স্কটল্যান্ডের Inverness-এ ৮৪ বছর বয়সে মারা যান। ATM আবিষ্কারের সঙ্গে তাঁর নাম বিশ্বব্যাপী স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০০৫ সালে তিনি OBE (Officer of the Order of the British Empire) সম্মানেও ভূষিত হন।
আজ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি শহরেই ATM যেন ব্যাংকের একটি ছোট, স্বয়ংক্রিয় শাখা। রাত-দিন, ছুটির দিন কিংবা ব্যাংকের কাউন্টার বন্ধ—কয়েকটি সংখ্যা আর একটি কার্ডের মাধ্যমে মুহূর্তেই পাওয়া যায় নিজের অর্থ।
আর সেই সুবিধার সূচনাপর্বের গল্পে তাই বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকেন শিলংয়ে জন্ম নেওয়া জন শেফার্ড-ব্যারন—যাঁর একটি অসময়ে ব্যাংক বন্ধ পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ব্যাংকিংয়ের এক বৈপ্লবিক ধারণা।