
বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী পুরুষ, মানবতার কণ্ঠস্বর এবং প্রেম ও স্বাধীনতার অমর গায়ক কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা সাধারণত তাঁর অগ্নিঝরা কবিতা, কালজয়ী গান এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়কে ঘিরে আজও নানা প্রশ্ন ও গবেষণার অবকাশ রয়েছে।
পেশাগত জীবনে আমি একজন ফার্মাসিস্ট। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত পাঠ ও প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে একসময় “Alzheimer’s Disease” বিষয়ক একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে আলোচনায় উঠে আসে যে, বার্ধক্যজনিত কারণ ছাড়াও অতীতে মস্তিষ্কে প্রাপ্ত আঘাত, রক্তক্ষরণ বা রক্তজমাট (Blood Clot) ভবিষ্যতে স্নায়বিক জটিলতার কারণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে Cerebrovascular Accident (CVA) বলা হয়, যা পরবর্তীকালে স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে নজরুলের জীবনের একটি ঘটনা স্মরণযোগ্য। জানা যায়, ঢাকায় অবস্থানকালে এক রাতে বাড়ি ফেরার পথে তিনি একদল যুবকের আক্রমণের শিকার হন এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পান। যদিও তিনি সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিলেন, তবুও সে সময় আধুনিক রোগনির্ণয় প্রযুক্তি যেমন CT Scan বা MRI ছিল না। ফলে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ ক্ষতি অদৃশ্যই থেকে যেতে পারে।
নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে, ওই আঘাতই তাঁর পরবর্তী স্নায়বিক জটিলতার একমাত্র কারণ ছিল। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে বিষয়টি ভাবনার খোরাক জোগায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দীর্ঘ অর্থকষ্ট, প্রিয় পুত্র বুলবুলের অকালমৃত্যুর বেদনা, স্ত্রী প্রমীলা দেবীর দীর্ঘ অসুস্থতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন। এসবই হয়তো ধীরে ধীরে তাঁকে এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
তবে জীবনের সকল দুর্দশাকে অতিক্রম করে নজরুল তাঁর সৃষ্টির মহিমায় হয়ে উঠেছেন অনন্য। তিনি বন্দীর অনশন ভেঙে জাগরণের ডাক দিয়েছেন, দারিদ্র্যের গান গেয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদ। তাঁর শব্দশক্তি আজও মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভালোবাসার মন্ত্র জাগিয়ে তোলে।
নজরুল তাই কেবল একজন কবি নন; তিনি এক চিরজাগ্রত চেতনা। তিনি কোথাও নীরব হয়ে যাননি। তাঁর কণ্ঠ আজও মানবতার কণ্ঠ, স্বাধীনতার কণ্ঠ, ভালোবাসার কণ্ঠ।
তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—সর্বকালের, সর্বযুগের বিজয়ী বীর।
[লেখক পরিচিতি: কবি আমিনুর রশিদ পিন্টু — যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি প্রবাসী। পেশায় একজন ফার্মাসিস্ট। সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। একসময় হাওয়াইয়ান গিটার বাদক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, সমাজ ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে তাঁর চিন্তাশীল লেখালেখি পাঠকমহলে সমাদৃত।]
