
“সার্টিফিকেট জাল ও আর্থিক–প্রশাসনিক অনিয়মে আগেই দুই কর্মকর্তার বিদায়—এবার ‘দুর্নীতির মহারানী’ খ্যাত প্রভাবশালী কর্মকর্তা বরখাস্ত”
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আমার টেলিভিশন
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা দুর্নীতির স্তূপ অবশেষে একে একে ভাঙতে শুরু করেছে। সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও আর্থিক-প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার পর, এবার বিদায় নিতে হলো বিটিভির অভ্যন্তরে বহুল আলোচিত ও ভয়ংকরভাবে প্রভাবশালী এক কর্মকর্তাকে—যিনি কর্মীদের মুখে মুখে পরিচিত ছিলেন ‘দুর্নীতির মহারানী’ নামে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে—স্মারক নম্বর ১৫.০০.০০০০.০০০.০২৩.২৭.০০১.২৫-৪৬৭, তারিখ ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫—বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রের কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোছা: মাহফুজা আক্তার (বর্তমানে সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রে সংযুক্ত)-কে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বরখাস্তের পেছনের মূল কারণ:
আমার টেলিভিশন–এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই বরখাস্ত কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। বরং ২০২২–২৩ অর্থবছরে বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের— মহা ব্যবস্থাপক পদে চলতি দায়িত্বে থাকাকালীন মাহফুজা আক্তার ঢাকা কেন্দ্রের শিল্পী সন্মানি কোডে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে বাজেট বরাদ্দের তুলনায় অতিরিক্ত ১৩.২৮ কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করে রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধন করেন।
এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক এবং বর্তমান মহাপরিচালক ০৬.০২.২০২৪ এবং ১৯.১১.২০২৪ তারিখ মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য যে, এ বিষয়ে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ০৭.১১.২০২৪ এবং ১৪.১১.২০২৪ তারিখ মোছাঃ মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধে ১৩.২৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়সহ অন্যান্য অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্ত্রণালয় থেকে বর্ণিত মাহফুজা আক্তার এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত করা হয়। তদন্তে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিভাগীয় মামলা নম্বর ০১/২০২৫ রুজু করা হয়। অভিযোগসমূহ তদন্তের জন্য ০১(এক) সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগপূর্বক তদন্ত করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ বিশেষ করে শিল্পী সম্মানী বণ্টন, অনুষ্ঠান বাজেট অনুমোদন, ব্যয় নির্ধারণ ও বিল পরিশোধ অযৌক্তিক ও বিধিবহির্ভূত এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’র শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এমতাবস্থায়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধিমালার বিধি ১২(১) অনুযায়ী মোছাঃ মাহফুজা আক্তার, কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্র (বর্তমানে সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রে সংযুক্ত)-কে সরকারি চাকুরি হতে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাদের আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে—
অভিযোগসমূহ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তদন্ত চলাকালীন সময়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রাখা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। সে কারণেই তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং বিধি অনুযায়ী তিনি বরখাস্তকালীন খোরপোষ ভাতা পাবেন। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
এখানেই শেষ নয়__
আমার টেলিভিশন–এর অনুসন্ধান বলছে, এটি শুধু একটি নামের পতন নয়—এটি একটি বলয়ের ভাঙন। বিটিভির ভেতরে আরও কয়েকটি ফাইল এখন তদন্তের টেবিলে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, খুব শীঘ্রই আরও কয়েকজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বরখাস্তের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিটিভির প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এই প্রক্রিয়াকে থামানো যাবে না। কেবল বরখাস্ত নয়—প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, জবাবদিহি ও দৃশ্যমান শাস্তি।
নতুন নতুন অনিয়ম, চাপা পড়ে থাকা নথি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আমার টেলিভিশন–এর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। সময়মতো, সত্যের স্বার্থে—সবই প্রকাশ পাবে।