
ভিডিওতে উঠে এসেছে ভয়ংকর চিত্র: পোস্টিং বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার অদৃশ্য লেনদেন
“কিভাবে ‘ভালো পোস্টিং’ হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক পণ্য—ঘুষ, মধ্যস্বত্বভোগী ও রাজনৈতিক প্রভাবের জালে বন্দী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা”
প্রশাসনের ভেতরে অদৃশ্য বাজার:
সরকারি চাকরির পোস্টিং ও ট্রান্সফার—আইনের ভাষায় যা একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই তা রূপ নিচ্ছে এক ভয়ংকর অদৃশ্য বাণিজ্যে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক ভিডিও ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন সব চিত্র, যেখানে ‘ভালো পোস্টিং’ যেন যোগ্যতার নয়, বরং টাকার অঙ্ক, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক আশীর্বাদের হিসাবেই নির্ধারিত হচ্ছে।
এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভিডিওতে দৃশ্যমান নমুনা, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ, এবং সংশ্লিষ্ট সেক্টরের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা যাচাই করে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে যেসব দৃশ্য ও কথোপকথন উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে—
পোস্টিং ও ট্রান্সফার সংক্রান্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে দরকষাকষি, সরকারি দপ্তরের ভেতর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে বড় অঙ্কের চেক ও নগদ অর্থ আদান–প্রদানের দৃশ্য, নির্দিষ্ট পোস্টিংয়ের জন্য হুইটলিস্টিং বা বাছাই তালিকা “পেমেন্টের বিনিময়ে” আপডেট হচ্ছে—এমন দাবিসহ কথোপকথন। কিছু ক্ষেত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এই লেনদেনের শীর্ষে রয়েছেন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী সুপারিশকারীরা।
উল্লেখ্য, ভিডিওগুলোতে দৃশ্যমান কথোপকথন ও লেনদেনের দাবি অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত ও আদালতের রায় ছাড়া এগুলোকে দোষ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
পোস্টিং বাণিজ্যের বিস্তার: শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বিভিন্ন মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পোস্টিং–ট্রান্সফার সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়।
অভিযোগ উঠেছে—
প্রশাসন ও জনপ্রশাসন: মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং (ডিসি, এসপি–সংলগ্ন দপ্তর, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট পদ) পেতে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন। রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ফাইলই “নড়ে না”—এমন অভিযোগ।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী: থানার ওসি, গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বা মেট্রোপলিটন পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ঘুষ ও লবিংয়ের অভিযোগ। কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাণিজ্যের শীর্ষে থাকে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত:
মেডিকেল কলেজ, বড় হাসপাতাল বা নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পোস্টিং পেতে অপ্রকাশ্য লেনদেনের অভিযোগ
বদলি ঠেকাতে বা পছন্দের জায়গায় থাকতে অর্থ ও প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ।
বিটিভি: পোস্টিং ও নিয়োগ ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ গণমাধ্যম ও শিল্পী সংগঠনের পক্ষ থেকে উঠে আসছে।
অভিযোগের সারসংক্ষেপ (Allegations):
নিয়োগ, বদলি ও শিল্পী তালিকাভুক্তিতে সিন্ডিকেট–নির্ভর নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তালিকাভুক্তি বা সুবিধা প্রদান, কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ, বিভিন্ন অনলাইন অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্মে দাবি করা হয়েছে—
নিয়োগ বা বিশেষ পোস্টিং পেতে লাখ থেকে কোটি টাকার অঙ্কে লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত “পোস্টিং–ট্রান্সফার বাণিজ্য” শিরোনামে কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি—এ বিষয়টি উল্লেখ করা নৈতিক ও আইনি দিক থেকে অপরিহার্য।
দুদক ও আর্থিক অনিয়ম- প্রাসঙ্গিক সূত্র:
বিটিভি–তে বিভিন্ন সময়ে— ভুয়া বিল–ভাউচার, শিল্পী তালিকাভুক্তিতে অনিয়ম, প্রকৌশল ও ক্রয়–সংক্রান্ত দুর্নীতি ইত্যাদি অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযান ও অনুসন্ধান হয়েছে।
যদিও এসব তদন্তে সরাসরি “পোস্টিং বাণিজ্য” শব্দটি সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়নি, তবে এগুলো প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি সংলগ্ন ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বিশ্লেষণ: কেন পোস্টিং বাণিজ্য ভয়ংকর:
প্রশাসনিক ক্ষয়: যোগ্যতা নয়, টাকা ও যোগাযোগ যখন সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হয়—তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দক্ষতা হারায়।
জনসেবার অবক্ষয়: ভুল জায়গায় ভুল মানুষ বসলে তার খেসারত দেয় সাধারণ নাগরিক।
দুর্নীতির চক্র: একবার টাকা দিয়ে পোস্টিং পাওয়া মানে—
“ওই টাকা তুলতে আবার দুর্নীতি”—এই দুষ্টচক্র শুরু হয়।
প্রশ্ন রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে:
সরকারি পোস্টিং ও ট্রান্সফারকে বাণিজ্যে পরিণত করা আইনি ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
বিটিভি সহ একাধিক সেক্টরে এ সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগ ও ভিডিও–নমুনা সামনে এসেছে।
কিন্তু চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত।
প্রশ্ন একটাই—
রাষ্ট্র কি এই অদৃশ্য বাজার ভাঙতে চায়, নাকি নীরবতাই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় সহযোগী?