
বিটিভি দুর্নীতির ‘মহারানী খ্যাত’ মাহফুজা আক্তার চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত: শুরু হলো দুর্নীতির সাম্রাজ্যের পতন
“দীর্ঘ আন্দোলন, অনুসন্ধান ও অকাট্য প্রমাণে প্রথমবার ঊর্ধ্বতন প্রভাবশালী কর্মকর্তার দৃশ্যমান শাস্তি। বিটিভির অন্দরমহলে ভূমিকম্প।”

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আমার টেলিভিশন
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও শিল্পী সমাজের প্রতি চরম অবহেলার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, অনুসন্ধান ও প্রামাণ্য অভিযোগ চলছিল—তারই ফলশ্রুতিতে এই প্রথমবারের মতো বিটিভির একজন ঊর্ধ্বতন ও প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি কার্যকর হলো।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জারি করা সরকারি আদেশ ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেলিভিশন ঢাকা কেন্দ্রের কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোছা: মাহফুজা আক্তার–কে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত (Dismissal from Service) করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর বলে ঘোষিত হয়েছে অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের দিন থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।

প্রজ্ঞাপনে কী বলা হয়েছে:
সরকারি নথি অনুযায়ী, মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধে—
ভুয়া ও Fabricated নোটশিট ও কাগজপত্র উপস্থাপন,
শিল্পী সম্মানী, অনুষ্ঠান বাজেট ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বিধিবহির্ভূত আর্থিক অনিয়ম, ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ ও রাষ্ট্রের অর্থের অপব্যবহার, এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’ অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে, ২০২২–২০২৩ অর্থবছরে ঢাকা কেন্দ্রের শিল্পী সম্মানী কোডে বরাদ্দের তুলনায় ১৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে গুরুতর আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়, যার কোনো বৈধ প্রশাসনিক অনুমোদন বা সঠিক Reconciliation ছিল না।
আমার টেলিভিশন-এর অনুসন্ধান ও শিল্পী সমাজের ভূমিকা:
এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।
বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও শিল্পী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবং বাংলাদেশ সৃজনশীল শিল্প সংস্কৃতি পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে—
বিটিভির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, এবং দুদক ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে অকাট্য প্রমাণসহ অভিযোগ দায়ের করে আসছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, আমার টেলিভিশন–এর একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মাহফুজা আক্তারের বিরুদ্ধে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও শিল্পী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর সদস্য সচিব পলাশ কুমার সাউ কর্তৃক দাখিলকৃত নথিপত্র ও হিসাবভিত্তিক অভিযোগই এই প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
দুদকের তদন্ত ও মামলার প্রস্তুতি:
আমার টেলিভিশন-এর অনুসন্ধানে আরও জানা যায়—
দুদকে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ইতোমধ্যে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, মামলার প্রস্তুতি প্রক্রিয়াধীন।
দুদক ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত সূত্র জানায়,
এই শাস্তি শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়—
এটি বিটিভির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি দুর্নীতির বলয় ভাঙার সূচনা। খুব শীঘ্রই অন্যান্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিটিভির ভেতরের প্রতিক্রিয়া:
বরখাস্তের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিটিভির ভেতরে আজ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এক ধরনের প্রশাসনিক ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে।
আমার টেলিভিশন জানতে পেরেছে—
ন্যায়নীতিবান ও দীর্ঘদিন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তি ও উল্লাস, কোথাও কোথাও মিষ্টি বিতরণ, এবং শিল্পীদের মধ্যে একটাই প্রশ্ন—
“এবার কি সত্যিই জবাবদিহির যুগ শুরু হলো?”
শিল্পী সমাজের প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশ সৃজনশীল শিল্প-সংস্কৃতি পরিষদ এর আহ্বায়ক খালিদ খলিল বলেন, “এটি কোনো ব্যক্তিগত বিজয় নয়। এটি শিল্পী সমাজের সম্মিলিত লড়াইয়ের ফল। আজ প্রমাণ হলো—সত্য চাপা থাকে না।”
বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও শিল্পী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এর সদস্য সচিব পলাশ কুমার সাউ বলেন, “আমরা আবেগে নয়, কাগজে-কলমে কথা বলেছি। হিসাব, নথি ও প্রমাণ দিয়েই অভিযোগ করেছি। এই শাস্তি প্রমাণ করে—শিল্পীদের আন্দোলন সঠিক পথে ছিল। এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহীন সামাদ বলেন, “বিটিভি আমাদের ঘর। সেই ঘরে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতেই হবে।”
একুশে পদকপ্রাপ্ত সুরকার শেখ সাদী খান বলেন, “ এই বরখাস্ত শিল্পী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। আমরা আশাবাদী- দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন- সে দেশের শত্রু। বিটিভির সকল দুর্নীতিবাজদের বিচারকার্য শেষে শাস্তি নিশ্চিত হলে তবেই সংস্কৃতির মর্যাদা ফিরবে।”
বিটিভির গুণী বাদ্যযন্ত্র শিল্পী ইফতেখার হোসেন সোহেল, মিলন ভট্টাচার্য, রিচার্ড কিশোর একক কণ্ঠে বলেন—
“চাকরি থেকে মাহফুজা আক্তার এর এই চূড়ান্ত বরখাস্ত একদিকে বিটিভির লুন্ঠিত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, তেমনিভাবে বিটিভির বঞ্চিত শিল্পী সমাজ তাদের ন্যায্যতা ফিরে পাবেন। আমরা সেদিনই দীর্ঘ ও বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নিতে পারব- যেদিন বিটিভির সকল দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত বরখাস্ত নিশ্চিত হবে এবং দুদক কর্তৃক তাদের বাকি শাস্তি নিশ্চিত হবে।”
বরখাস্তের পর পালানোর শঙ্কা: দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞার দাবি শিল্পী সমাজের:
বাংলাদেশ টেলিভিশনে দুর্নীতির অভিযোগে একের পর এক কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত এবং চূড়ান্ত শাস্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্পী সমাজে।
আমার টেলিভিশন বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছে, যেসব কর্মকর্তা বর্তমানে দুদকের তদন্তাধীন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের শাস্তিমূলক প্রক্রিয়ায় রয়েছেন—তাদের একটি অংশ বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সংস্কৃতি ও শিল্পী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন জোরালোভাবে দাবি জানিয়েছে— অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যালার্ট জারি করে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে, যাতে বিচার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।
এ বিষয়ে সংগঠনের আহ্বায়ক, বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসিম উদ্দিন বলেন— “আমরা বারবার দেখেছি, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর প্রভাবশালীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এবার তা হতে দেওয়া যাবে না। যারা রাষ্ট্রের অর্থ লুট করেছে, শিল্পীদের ন্যায্য সম্মানী আটকে দিয়েছে—তাদের বিচার দেশের মাটিতেই হতে হবে। ইমিগ্রেশন নিষেধাজ্ঞা এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, “মাহফুজা আক্তারের বরখাস্ত প্রমাণ করেছে—আন্দোলন ও প্রমাণ থাকলে বিচার সম্ভব। কিন্তু বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। রাষ্ট্রকে এখন কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।”
শিল্পী সমাজ মনে করে, বিটিভিতে ন্যায়বিচারের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে—তা সফল করতে হলে দুদক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
শেষ কথা:
মাহফুজা আক্তারের বরখাস্ত কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়— এটি শিল্পী সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ন্যায়বিচারের স্বীকৃতি।
আমার টেলিভিশন বিশ্বাস করে— এই প্রক্রিয়া যদি ধারাবাহিক থাকে, তবে বিটিভি আবারও হতে পারে শিল্পী, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার প্রকৃত আশ্রয়স্থল।