
“অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে অনুদান, দ্বৈত বাজেট ব্যয় ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ—সরকারি নথি ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠছে নানা প্রশ্ন “
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিদায়ী উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী-কে ঘিরে একাধিক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। একইসঙ্গে কিছু গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়েও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন পাওয়া যায়নি তবে গোয়েন্দা সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে অনুদানের অভিযোগ:
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের অনুদান তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, চারু শিল্প ও থিয়েটার খাতে সারাদেশে ৩০০-এর বেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকার অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, রূপনগর, সেনপাড়া, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় কোনো কার্যক্রম বা সাইনবোর্ড পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এই অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ:
‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ প্রকল্প নিয়েও একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি—
একই প্রকল্পে দুই উৎস থেকে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর-এর বাজেট থেকেও ব্যয় করা হয়েছে। আইনগত কাঠামো পরিবর্তনের পরও পুরোনো বাজেট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল পরিশোধের ঘটনাও ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
টেন্ডার ছাড়াই কেনাকাটা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, আসবাবপত্র ও প্রযুক্তি সরঞ্জাম ক্রয়ে যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুযায়ী, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া নির্দিষ্ট ভেন্ডারকে কাজ প্রদান করা আইনসম্মত নয়। তবুও কয়েকটি ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ব্যয়ে বিল তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন:
জাদুঘরের জনবল নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।, স্বল্প নোটিশে নিয়োগ প্রক্রিয়া, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগের উদ্যোগ, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা। যেখানে অন্যান্য জাদুঘরে সীমিত জনবল বরাদ্দ রয়েছে, সেখানে এই প্রকল্পে কয়েকশ’ জন নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।
শোকের দিনে কনসার্ট বিতর্ক:
গত বছর ৩০ মে, জিয়াউর রহমান—শহীদ প্রেসিডেন্ট ও দেশের সফল একজন রাষ্ট্রনায়কের শাহাদাত বার্ষিকীর দিনে নজরুল ইন্সটিটিউট-এ একটি কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী-এর অনুমোদনেই এই আয়োজনের পরিকল্পনা এগিয়েছিল। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কর্মীরা দিনটির গভীর তাৎপর্য বিবেচনায় এ ধরনের আয়োজনকে অনুপযুক্ত বলে সমালোচনা করেন এবং প্রতিবাদ জানান। তাদের মতে, একজন সফল রাষ্ট্রনায়কের শাহাদাত দিনে এমন আয়োজন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদের মুখে আয়োজকরা অনুষ্ঠানটির তারিখ পরিবর্তন করতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা: গুঞ্জন নাকি বাস্তবতা?
কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হলেও, এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি সংস্থা—যেমন দুদক বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, দেশত্যাগে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুতর এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার সঙ্গে জড়িত। তবে দুদক বা সরকারি কোন সংস্থা কর্তৃক অভিযোগগুলো এখনো তদন্ত করা হয়নি বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত একথা বলা যাবে না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্পাদকীয় মন্তব্য:
এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যগুলো বিভিন্ন নথি, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে গণ্য করা আইনসম্মত নয়।