
“দেশেই উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেন, তবুও জনভোগান্তি—আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে সরবরাহ বিশৃঙ্খলা ও কৃত্রিম সংকটের ইঙ্গিত”
দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার এখন কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি এক গভীর ব্যবস্থাপনা সংকট ও আস্থাহীনতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা—বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অসাধু চক্রের কারসাজিতেই এই সংকট তীব্র হয়েছে।
রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলী, তেজগাঁও, উত্তরা, রামপুরা ও শাহবাগসহ বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, শত শত যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছে না। কোথাও সীমিত সরবরাহ, কোথাও ‘তেল নেই’—এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য—দেশে ব্যবহৃত পেট্রোল ও অকটেনের প্রায় ৭০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন এবং অকটেনের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক।
পেট্রোবাংলার আওতাধীন Sylhet Gas Fields Limited প্রতিদিন কয়েক হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল ও কেরোসিন উৎপাদন করছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে প্রায় ৪২০ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৭৪ মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদিত হচ্ছে।
অন্যদিকে Eastern Refinery Limited ক্রুড অয়েল পরিশোধনের মাধ্যমে বাকি চাহিদা পূরণ করছে। পাশাপাশি চারটি বেসরকারি রিফাইনারিও আমদানিকৃত কনডেনসেট থেকে জ্বালানি উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে। ফলে সামগ্রিকভাবে পেট্রোল আমদানির প্রয়োজন প্রায় নেই বললেই চলে।
এই বাস্তবতার পরও পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং জনভোগান্তি বড় প্রশ্ন তৈরি করছে—সংকটটি কি বাস্তব, নাকি পরিকল্পিত?
সরকার পরিস্থিতির জন্য ‘প্যানিক বায়িং’কে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও আস্থার সংকট। অতীতে মজুত সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করেছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
এদিকে এই সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাতে। ডিজেলের অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
জ্বালানি মন্ত্রীর বক্তব্য:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী Iqbal Hasan Mahmud Tuku জানিয়েছেন, দেশে তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বরং গত বছরের তুলনায় বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে আতঙ্কে অতিরিক্ত ক্রয় এবং কালোবাজারি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, অসাধু চক্র অবৈধভাবে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ Dr. Ijaz Hossain মনে করেন, সরকার সংকট না থাকার কথা বললেও বাস্তবে জনগণের ভোগান্তি প্রমাণ করে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও গুরুতর সমস্যা রয়েছে।
তার মতে, প্রকৃত বাস্তবতা জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করাও বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন ও সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উপসংহার:
আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে স্পষ্ট—দেশে উৎপাদন ও মজুত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাম্পে তেলের সংকট মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আস্থার ঘাটতি এবং অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজির ফল।
পাম্পের দীর্ঘ লাইন শুধু জ্বালানি সংকটের নয়, বরং জনগণের মনে জন্ম নেওয়া অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বচ্ছতা, কঠোর নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর বণ্টন ব্যবস্থার দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।