
“দুদকের রেড সিগন্যাল ও আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে ধরাশায়ী বিতর্কিত এই প্রকৌশলী; গুঞ্জন এখন সাময়িক বরখাস্তের।”
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রকৌশল ও প্রশাসনিক শাখায় বইছে পদোন্নতির আনন্দ। গত ৭ মে ২০২৬ (২৪ বৈশাখ ১৪৩৩) তারিখে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বিটিভির ৭ জন কর্মকর্তাকে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। তবে এই আনন্দের মাঝেও বিটিভির অলিতে-গলিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—‘কী নেই’ সেই তালিকায়।
আমার টেলিভিশন-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহুল বিতর্কিত এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মো. মনিরুল ইসলামের নাম এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা সংশ্লিষ্ট মহলে মন্ত্রণালয়ের একটি ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক পদক্ষেপে স্বস্তি:
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন (নম্বর: ১৫.০০.০০০০.০২৩.১২.৩৯৭.২৫.১৮২) বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিটিভির ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ৪র্থ, ৫মে ও ৬ষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফেরাতে মন্ত্রণালয়ের এই ‘নিষ্কণ্টক’ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিটিভির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে এই তালিকার বাইরে থাকা নামগুলোই এখন ‘টক অব দ্য বিটিভি’।
অনুসন্ধানে মনিরুল: দুর্নীতির বরপুত্র যখন খাদের কিনারায়
এর আগে আমার টেলিভিশন-এর ধারাবাহিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল বিটিভির প্রকৌশল বিভাগের ‘গুপ্তধনক্ষেত্র’ ও সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মো. মনিরুল ইসলামের উত্থানের লোমহর্ষক কাহিনী। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সাবেক তথ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (NSI) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যানুযায়ী:
টেন্ডার সিন্ডিকেট: সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের নাম ভাঙিয়ে বিটিভির প্রকৌশল সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম।
অকাট্য প্রমাণ: দুদকের হাতে মনিরুলের অবৈধ সম্পদের পাহাড় ও আর্থিক অনিয়মের প্রামাণ্য দলিল পৌঁছেছে, যা এখন মামলা দায়েরের চূড়ান্ত পর্যায়ে।
পদোন্নতি বঞ্চিত থেকে বরখাস্তের পথে?
মন্ত্রণালয়ের এই নতুন তালিকা থেকে মনিরুল ইসলামের বাদ পড়াকে কেবল একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিটিভির সদর দপ্তরে এখন জোরালো গুঞ্জন—যেকোনো সময় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, দুদকের মামলা এবং এনএসআই-এর নেতিবাচক প্রতিবেদনের পর তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা বা পদোন্নতি দেওয়া সরকারের জন্য বড় ধরনের ভাবমূর্তির সংকটের কারণ হতে পারত।
মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের যুগান্তকারী পদক্ষেপ: স্বচ্ছতার নতুন দিগন্ত:
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিটিভিতে প্রথমবারের মতো এই স্বচ্ছ পদোন্নতি আইনের শাসনেরই প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় বিতর্কিত প্রকৌশলী মনিরুলকে বাদ দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, তার জন্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ বিশেষ ধন্যবাদের দাবিদার।
দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার অংশ হিসেবে মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর বিচক্ষণ দিকনির্দেশনায় দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙ্গে সচিব মাহবুবা ফারজানা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে এক ধাপ এগিয়ে গেল বলে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অতঃপর সচিব মাহবুবা ফারজানা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সকল পর্যায়ের জমে থাকা দুর্নীতির অভিযোগের দিকে স্বপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগী ভূমিকা রাখবেন এমনটি সকলে আশা করেন। “আমার টেলিভিশন” ও বিটিভি রক্ষার আন্দোলনকারীরা এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশা: দ্রুত আইনি ব্যবস্থা:
কেবল পদোন্নতি বঞ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; আন্দোলনকারীদের এখন একটাই দাবি—দুদক ও এনএসআই-এর রিপোর্টের ভিত্তিতে মনিরুলকে দ্রুত সাময়িক বা স্থায়ী বরখাস্ত করে এই ‘দুর্নীতির বিষবৃক্ষ’ উপড়ে ফেলা হোক।
উপসংহার
মন্ত্রণালয়ের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। তবে কেবল পদোন্নতি বঞ্চিত করাই শেষ কথা নয়, বরং লুটপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।