
“পাহাড়প্রমাণ অনিয়মের তুঘলকি কান্ড, গোয়েন্দা সংস্থাকে বুড়ো আঙুল! সিকিউরিটি ভেটিং ছাড়াই ভিভিআইপি-দের কাছাকাছি যাওয়ার ভয়ঙ্কর চেষ্টা! কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর মানসিক নির্যাতন, বেসামাল বিটিভি প্রশাসন”
বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) বিতর্কিত চিত্রগ্রাহক এ বি এম নুরুল ইসলাম বাচ্চুকে ঘিরে প্রশাসনিক অরাজকতার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ে সংযুক্তির আদেশ হলেও সেখানে তার যোগদান গৃহীত হয়নি—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় বিটিভি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি না জানিয়ে কোন ধরনের দায়িত্ব পালন না করে তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ঢাকা কেন্দ্রকে ঘিরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলছেন চিত্রগ্রাহক (গ্রেড-২) এ বি এম নুরুল ইসলাম বাচ্চু। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অডিট শাখার সহকারী সচিব (নন-ক্যাডার) স্ত্রী মোসাম্মৎ শাহনাজ বেগমের প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিটিভিতে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি যানবাহনের অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর সব অভিযোগ এখন টক অব দ্য বিটিভি।
প্রেস উইংয়ে যোগদান জটিলতা ও তথ্য গোপন:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ে সংবাদ কাভারেজের জন্য বিটিভি থেকে (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ স্মারক নং- ১৫.৫৪.৩০২৫.০০১.০২১.১৮.০০০১.২৩.৩৭৯ ) অফিস আদেশের মাধ্যমে ৮ জনকে সংযুক্ত করা হলেও রহস্যজনক কারণে নুরুল ইসলাম বাচ্চুর যোগদান গ্রহণ করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, যোগদান গৃহীত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর অবিলম্বে তার মূল দপ্তরে ফিরে আসার কথা। কিন্তু বাচ্চু এই তথ্য গোপন করে দীর্ঘ সময় নিজেকে ‘সংযুক্ত কর্মকর্তা’ হিসেবে জাহির করেছেন। এর ফলে তিনি না মূল দপ্তরে নিয়মিত হাজিরা দিয়েছেন, না সংযুক্ত দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিকিউরিটি ভেটিংয়ে অনীহা: নেপথ্যে কী?
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের মতো অতি সংবেদনশীল স্থানে দায়িত্ব পালনের আগে ‘সিকিউরিটি ভেটিং’ বা নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য তথ্য ফরম পূরণ করা বাধ্যতামূলক। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থা (NSI ও DGFI) থেকে দু’বার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও নুরুল ইসলাম বাচ্চুসহ কয়েকজন রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান তথ্য ফরম পূরণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তারা ঔদ্ধত্যের সাথে জানিয়েছেন যে, তাদের ‘ভেটিং প্রয়োজন নেই’। নিরাপত্তা সংস্থার নির্দেশনা অমান্য করে এই বিতর্কিত ব্যক্তিদের ভিভিআইপি-র আশেপাশে যাওয়ার সুযোগ একটি গভীর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়। তবে নিরাপত্তা তথ্য ফরম পূরণ করা নিয়ে বিটিভি কর্তৃপক্ষ বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে আছে বলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সূত্র মাধ্যম জানা যায়। মূলত নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করায় এবং নেতিবাচক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের আশঙ্কায় নুরুল ইসলাম বাচ্চুর যোগদান স্থগিত করা হয় বলে প্রেস উইং ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অফিশিয়ালি বিটিভিতে অনুপস্থিত:
সংযুক্তি কার্যকর না হওয়া সত্ত্বেও নুরুল ইসলাম বাচ্চু বিটিভিতে নিয়মিত হাজিরা দেননি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি প্রায়শই অফিসিয়াল কাজের দোহাই দিয়ে বিটিভির লোগোযুক্ত সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছেন। ট্রান্সপোর্ট পুলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট গাড়ির একজন ড্রাইভার আমার টেলিভিশনকে নিশ্চিত করেছেন যে গাড়ির লগবুক যথাযথভাবে ব্যবহার না করে এবং ভুয়া তথ্য প্রদানের মাধ্যমে বাচ্চু মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দপ্তরে ব্যক্তিগত তদবির চালিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে আমরা অসহায়। কেননা সে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের কথা বলে দাপট খাটিয়ে সরকারি যানবাহন বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছে। এ বিষয়ে ট্রান্সপোর্টের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান যে, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। বিষয়টি জিএম এর আওতাভুক্ত। ‘সরকারি যানবাহন (ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০২৪’ অনুযায়ী, অননুমোদিতভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন:
সংযুক্তি আদেশ ঝুলে থাকা অবস্থায় বাচ্চুকে সম্প্রতি তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বেসরকারি একটি অনুষ্ঠান কাভার করার দায়িত্ব দেওয়া হয় নুরুল ইসলাম বাচ্চুকে, যা প্রশাসনিকভাবে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে। একজন কর্মী যার দাপ্তরিক অবস্থানই অস্পষ্ট (না প্রেস উইংয়ে, না বিটিভিতে), তাকে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রির কাভারেজের দায়িত্ব দেওয়া হলো—তা নিয়ে খোদ বিটিভির ভেতরেই কানাঘুষা শুরু হলে এবং বিষয়টি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হলে শেষ পর্যন্ত তাকে উক্ত দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
জ্যেষ্ঠতা ও বদলি নীতি লঙ্ঘন:
সরকারি চাকরির প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী ৩ বছর অন্তর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও নুরুল ইসলাম বাচ্চু গত ২৪ বছর ধরে একই কেন্দ্রে বহাল থাকা (মাঝখানে চট্টগ্রামে ৪ মাস, এবং সিলেটে তিন মাস মাত্র অবস্থান) এবং প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় ২২ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে টপকে চীন সফরে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। এই ‘আকাশচুম্বী’ প্রভাবের পেছনে ‘স্ত্রী’ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (নন-ক্যাডার) হওয়ার সুবাদে বাচ্চু প্রশাসনিক তদারকির ঊর্ধ্বে অবস্থান করেছেন এবং বিটিভিতে একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইনি ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দায়বদ্ধতা:
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, নুরুল ইসলাম বাচ্চুর এই কর্মকাণ্ড নিম্নোক্ত আইনি ধারাগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন:
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮: তথ্য গোপন করা, কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করা এবং দায়িত্বের অবস্থান সম্পর্কে অস্পষ্টতা তৈরি করা চরম ‘অসদাচরণ’।
বেতন ও ভাতা আত্মসাৎ: প্রকৃত কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে বা কোনো দপ্তরেই যোগদান না করে বেতন-ভাতা গ্রহণ করা- আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি কোষাগারের অর্থ আত্মসাতের পর্যায়ভুক্ত।
বিটিভির প্রশাসনিক ব্যর্থতা:
দীর্ঘ সময় একজন কর্মকর্তার প্রকৃত অবস্থান যাচাই না করে তাকে বেতন-ভাতা প্রদান এবং সরকারি গাড়ি অপব্যবহারের বিষয়টি বিটিভি কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক তদারকির চরম দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। কোনো অদৃশ্য শক্তির চাপে কর্তৃপক্ষ নীরব ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নিয়োগ সিন্ডিকেট ও আর্থিক লেনদেন:
বিটিভির সাবেক জিএম নুরুল আযম পবনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বাচ্চুর বিরুদ্ধে শতাধিক অবৈধ ও অনিয়মতান্ত্রিক অস্থায়ী জনবল নিয়োগের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি নিয়োগের নেপথ্যে ছিল বিপুল অংকের আর্থিক লেনদেন। ক্যামেরা শাখার প্রশাসনিক ও কার্যনির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তার একক দাপট কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে রেখেছে।
তথ্য পাচার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি:
আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে বিভিন্ন সূত্র মাধ্যম থেকে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগটি উঠে আসে- “রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার”। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে স্ত্রীর পদাধিকার বলে মন্ত্রণালয়ের অতি গোপন সিদ্ধান্তগুলো বিটিভিতে আসার আগেই বাচ্চু জেনে যেতেন। বাংলাদেশের Official Secrets Act, 1923 অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ নথি বা তথ্য পাচার করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে নুরুল ইসলাম বাচ্চু এবং তার স্ত্রী শাহানাজ বেগম এর ক্ষেত্রে সংবিধান ও শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী এটি কেবল বিশ্বাসভঙ্গ নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সামিল, যার প্রতিকার হিসেবে কঠোর নজরদারি ও মামলা দায়েরের বিধান রয়েছে।
চরম ঔদ্ধত্যতা ও :সরকারি আদেশ অমান্য:
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একজন ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গেলে কন্ট্রোলার পার্থ রেজা, নুরুল ইসলাম বাচ্চুকে তার ক্যামেরাটি দেওয়ার নির্দেশ দেন (যেহেতু বাচ্চু বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বে নেই)। কিন্তু বাচ্চু সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ক্যামেরা দিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত একজন জুনিয়র ক্যামেরাম্যানের সেট দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পন্ন করতে হয়। একজন সাধারণ চিত্রগ্রাহক হয়ে সরকারি আদেশ অমান্য করা ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর চরম লঙ্ঘন।
আইনি বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত:
বিশেষজ্ঞদের মতে- নুরুল ইসলাম বাচ্চুর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ প্রমাণিত হলে তিনি নিম্নোক্ত আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য হবেন:
(১)সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮: ক্ষমতার অপব্যবহার ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য। (২)
Official Secrets Act, 1923: রাষ্ট্রীয় তথ্য ফাঁসের জন্য।
ঢেলে সাজানো হচ্ছে বার্তা বিভাগ- গুরুত্বপূর্ণ সভা:
আমার টেলিভিশন জানতে পেরেছে আগামী ১৭ মে তারিখ রোববার উপ-মহাপরিচালক (বার্তা)-এর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সভায় বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে বার্তা বিভাগকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যারা সিকিউরিটি ভেটিং ফরম পূরণ করেনি, তাদের ভিভিআইপি কাভারেজ থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতির প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া বার্তা বিভাগের মান উন্নয়ন, চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিউজ কাভারেজ এর ক্ষেত্রে সিকিউরিটি ভেটিং সম্পূর্ণ ও দক্ষ ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব দেওয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেষ কথা:
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিটিভির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এই সিন্ডিকেট ভাঙা জরুরি। নুরুল ইসলাম বাচ্চুর মতো ব্যক্তিদের ক্ষমতার উৎস, সরকারি আদেশ অপেক্ষা করা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধোঁকা দেওয়া, প্রেস উইং এর বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা সহ তার বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
অন্যথায়, সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিটিভির স্বাভাবিক সম্প্রচার ও পেশাদারিত্বকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, চেইন অফ কমান্ডের অবশিষ্টটুকু ভেস্তে যেতে পারে।
আমার টেলিভিশন – সত্যের সন্ধানে নির্ভীক।