
“৫০ মিনিটের অনুষ্ঠান কাগজে ২০০ মিনিট • হাজির না হয়েও লাখ টাকা নিলেন অভিনেতা আলমগীর • নেপথ্যে ফ্যাসিবাদের দোসররা ▪︎ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার দোহাই দিয়ে নিয়মনীতির বলি • ক্ষুব্ধ খোদ বিটিভির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।”
রাষ্ট্রীয় লোকসানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আনন্দমেলা’র আড়ালে বিপুল অঙ্কের টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ৫০ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানের বাজেট ও সম্মানী বাড়াতে নথিপত্রে সেটিকে ২০০ মিনিট দেখানো হয়েছে। এমনকি অনুষ্ঠানে অংশ না নিয়েও এক খ্যাতিমান অভিনেতা পেয়েছেন লাখ টাকার ওপর সম্মানী। বিগত ফ্যাসিবাদের সহযোগী একদল শিল্পী ও কুশলী বিটিভির বর্তমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এবারের ঈদের বিশেষ ‘আনন্দমেলা’ অনুষ্ঠানে কেবল সম্মানী বাবদই ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। বিটিভির বিধিবদ্ধ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো বিল তৈরি করে এই টাকা ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে।
কাগজের দৈর্ঘ্য ২০০ মিনিট, বাস্তবে ৫০!
বিটিভির ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো ৫০ মিনিটের অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি নথিপত্রে ২০০ মিনিট দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল পাস করার ঘটনা ঘটল। অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা ও পরিকল্পনা করেছেন কবির বকুল। তাকে মৌলিক রচনার জন্য ৫৯ হাজার ১২৫ টাকা সম্মানী দেওয়ার পাশাপাশি, নৃত্যনাট্যের নামে মিনিটপ্রতি ১ হাজার ৯৬৯ টাকা হারে অতিরিক্ত আরও ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬০ টাকা দেওয়া হয়েছে। ৫০ মিনিটের একটি স্ক্রিপ্টের জন্য এত বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়াকে নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
অংশ না নিয়েও লাখ টাকার বিল:
সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে অভিনেতা এম এ আলমগীরের ক্ষেত্রে। তিনি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। অথচ তার নামে ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী তোলা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুষ্ঠানের সহযোগী প্রযোজক ইয়াসমিন আখতারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সত্যতা স্বীকার করে বলেন:
”অভিনেতা আলমগীর হোসেন এই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। মূলত কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার সম্মানী ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করার জন্য কৌশল হিসেবে স্বামী ও স্ত্রীর নামে আলাদা দুটি বিল দেখানো হয়েছে।”
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থেকেও কীভাবে বিল দেওয়া হলো, তা নিয়ে বিটিভির ভেতরে-বাইরে তীব্র সমালোচনা চলছে।
’ফ্যাসিবাদ’ দোসরদের পকেট ভারী: কে কত পেলেন?
বিটিভির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগীরা বসে আছেন এবং তাদের নির্দেশেই এই অর্থ বণ্টন হয়েছে। এবারের অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন আওয়ামীপন্থি অভিনেতা আফরান নিশো, যার সম্মানী ধরা হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার টাকা।
অন্যান্য শিল্পীদের সম্মানীর খতিয়ান:
রুনা লায়লা (কণ্ঠশিল্পী): ২ লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা (পাশাপাশি স্বামীর নামে ১ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা)। সাদিয়া ইসলাম মৌ (নৃত্যশিল্পী): নৃত্যের জন্য ৬৭ হাজার টাকা এবং একই অনুষ্ঠানে নৃত্যনাট্যের জন্য ১ লাখ৯৫ হাজার টাকা। বেবি নাজনীন (কণ্ঠশিল্পী): ২ লাখ ২২ হাজার ২০০ টাকা। নাজমুন মুনিরা ন্যানসি (বিশেষ শ্রেণী): ৫৬ হাজার টাকা। সাবিলা নুর (অভিনেত্রী): ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই, দায় এড়ালেন মহাপরিচালক:
বিটিভির নিয়ম অনুযায়ী, শিল্পীদের নির্দিষ্ট ক্যাটাগরি এবং একুশে বা স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্মানী বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি।
এই প্রসঙ্গে বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক কামরুন্নেসা হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিল্পী ও লেখকদের সম্মানীর ক্ষেত্রে অতীতে কখনো বিধিবদ্ধ নিয়ম লঙ্ঘন করা হতো না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অনৈতিক।”
জানতে চাইলে বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক মাহবুবুল আলম পুরো বিষয়টি থেকে দায় এড়িয়ে বলেন, “ঈদের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দাপ্তরিকভাবে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। সে কারণে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
মন্ত্রণালয়ের প্রচ্ছন্ন ইশারায় রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যমে এমন হরিলুট চলায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
শেষ কথা:
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যমে উৎসবের আমেজে যে হরিলুট ও জালিয়াতির চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং চরম নীতিবিগর্হিত। ‘আনন্দমেলা’র মতো একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পর্দার আড়ালে ঘটা এই ভুতুড়ে বিল ও স্বজনপ্রীতির উৎসব প্রমাণ করে যে, বিটিভির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো অনিয়মের সিন্ডিকেট কতটা সক্রিয়। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এই পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি, যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের এমন অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়।