
“প্রকৌশলী তামজীদ ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরে এস্টিমেট বিক্রি, পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ, সীমিত প্রতিযোগিতায় টেন্ডার এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ; সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫–এ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি এবং পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিভাগের প্রকৌশলী তামজীদ এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত না করেই মোটা অঙ্কের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে একের পর এক প্রকল্পের এস্টিমেট বিক্রি, পছন্দের প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ প্রদান এবং দ্রুত বিল পরিশোধের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে জানা যায়, সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের নির্মাণাধীন পাঁচতলা ভবনের মূল নির্মাণকাজ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের পঞ্চম তলার কাজ চলমান থাকলেও এর ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) খাতের একাধিক কাজের টেন্ডার সম্পন্ন করে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের শেষেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই এ ধরনের বিল পরিশোধে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের ওটিএম টেন্ডার আইডি-১০০২৬৪৬–এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদে ১ হাজার কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মেসার্স মামুন অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের কার্যাদেশ পায়। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হলে সরকার প্রায় ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা সাশ্রয় করতে পারত। আরও অভিযোগ রয়েছে, সাবস্টেশনের যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন আগে গুদামজাত করা হলেও তা এখনও ব্যবহার না হওয়ায় কার্যক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই অর্থবছরে টেন্ডার আইডি-১০৩৭৪১০–এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট মাজার মসজিদের জন্য ২৫০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহ ও স্থাপনের কাজ প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা মূল্যে গেজ বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, সীমিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মাত্র ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম দরে কার্যাদেশ প্রদান করায় সরকারের আর্থিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এছাড়া ওটিএম টেন্ডার আইডি-১২২০২৫৭–এর মাধ্যমে ৬৩০ কেজি ধারণক্ষমতার একটি প্যাসেঞ্জার লিফট, টেন্ডার আইডি-১১২৯৮৩৩–এর মাধ্যমে দুটি এস্কেলেটর এবং টেন্ডার আইডি-১১৯০০১৪–এর মাধ্যমে আরও একটি ৬৩০ কেজি ধারণক্ষমতার প্যাসেঞ্জার লিফট সরবরাহ ও স্থাপনের কাজও পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব টেন্ডারের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষের কথাও জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, একই প্রকল্পের আওতায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার কাম প্যাসেঞ্জার লিফট, ফোর্স ভেন্টিলেশন সিস্টেম, সোলার ও সার্জ প্রোটেকশন ব্যবস্থা, বিশেষ আলোকসজ্জা, সিসিটিভি, সাউন্ড ও নেটওয়ার্কিং সিস্টেম এবং ভিআরএফ ও স্প্লিট টাইপ এয়ার কুলিং সিস্টেম–সংক্রান্ত কয়েকটি বড় প্রকল্পে শতকোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির একটি অংশ বাস্তবে কোথায় সংরক্ষিত আছে অথবা আদৌ সরবরাহ করা হয়েছে কি না—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধেও পার্সেন্টেজ বাণিজ্য ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী বলে দাবি করা কয়েকজন ঠিকাদারের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রেই কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই কিংবা কাজের অগ্রগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্য রেখে কাজের মূল্যের ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি অর্থ কমিশন হিসেবে দাবি করা হতো।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও দাবি করেছে, রাজিয়া সুলতানা এর আগে রংপুর বিভাগে কর্মরত থাকাকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজে নকশাবহির্ভূত ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ নিয়েও আলোচনায় ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আমার টেলিভিশনের পক্ষ থেকে প্রকৌশলী তামজীদ এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, সচেতন মহল ও অভিযোগকারীরা।