October 25, 2026, 7:50 am
শিরোনাম :
ফেসিয়াল প্লাস্টিক সার্জারি: চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মেলবন্ধন বিটিভি: ​চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিচার ও অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ ছাড়া বিটিভির আধুনিকায়ন কেবলই অর্থের অপচয়  শিশুর হাসিতে ফিরুক আত্মবিশ্বাস: প্লাস্টিক সার্জারিতে নিখুঁত রূপ পাচ্ছে বিকৃত ক্ষতচিহ্ বিটিভি কর্মীর মৃত্যু, তিন মাসের বেতন বকেয়ার প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কি লাল ফিতার ফাঁদে? তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানার অপসারণ দাবি: বিটিভি বাঁচাও ও সমমনা জোটের কঠোর হুঁশিয়ারি মেধা বনাম আমলাতন্ত্র: বিটিভির ডিজির ক্ষমতা খর্বের নেপথ্যে কী? শিল্পকলা একাডেমিতে মিউজিক্যাল চেয়ার: রেজাউদ্দিন স্টালিনের মেয়াদ শেষ, সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন “সাংবাদিকরা বিত্তবান হতে চায় না, চায় নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন”— জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যকে সাধুবাদ, পার্থর দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষা শিলংয়ে জন্ম, চট্টগ্রামের সঙ্গে পারিবারিক যোগ—যে ব্রিটিশ উদ্ভাবক বদলে দিলেন টাকা তোলার ইতিহাস! ​বিটিভির জন্য বড় দুঃসংবাদ: হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ মনিরুলই হতে চলেছেন প্রধান প্রকৌশলী!
Notice :

লটারিতে গণবদলি, কেপিআইতে অনভিজ্ঞ প্রকৌশলী—গণপূর্তে ‘স্বচ্ছতা’র নামে নতুন প্রশ্ন?

জ্যেষ্ঠ নিজস্ব প্রতিবেদক || আমার টেলিভিশন || ঢাকা

“নীতিমালা উপেক্ষার অভিযোগ | গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ | প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে নানা অভিযোগ, তদন্তের দাবি”

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে শুরু হয়েছে লটারির মাধ্যমে গণবদলি ও পদায়ন। কিন্তু অনিয়ম ও তদবিরের অবসানের পরিবর্তে এই প্রক্রিয়াই এখন জন্ম দিয়েছে নতুন কিছু প্রশ্নের। কর্মকর্তাদের অভিযোগ—অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, দায়িত্বের ধরন এবং ব্যক্তিগত ও মানবিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু লটারির ভিত্তিতে পদায়ন করায় প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, ভিআইপি এলাকা এবং কেপিআই (Key Point Installation)-এর মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাংশের দাবি, এসব স্থাপনায় কার দায়িত্ব কতটা উপযুক্ত—তা নির্ধারণে শুধু লটারির ফল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিবেচনা।

৭৬৭ জন দিয়ে শুরু, এরপর আরও ২৫৪:

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ জুলাই প্রথম পর্যায়ে লটারির মাধ্যমে ৭৬৭ জন সিভিল উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়ন করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩১৭, চট্টগ্রামে ১৩৩, রাজশাহীতে ৭৩, খুলনায় ৭৪, বরিশালে ৪৪, সিলেটে ৩৩, ময়মনসিংহে ২৯ এবং রংপুরে ৬৪ জন রয়েছেন।

এরপর ৩ আগস্ট ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল—ই/এম শাখার ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে একই পদ্ধতিতে বদলি করা হয়। সূত্রের দাবি, গতকাল ১১ আগস্ট সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলির পরিকল্পনা ছিল এবং সর্বশেষ এ বিষয়ে তথ্য জানা যায়নি, তবে চলতি মাসের শেষ নাগাদ নির্বাহী প্রকৌশলীদেরও লটারির মাধ্যমে বদলির পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু একটি পর্যায়ের বদলি নিয়ে নয়—গণপূর্ত অধিদপ্তরের পুরো পদায়ন কাঠামোতেই লটারির পদ্ধতি কতটা কার্যকর ও নিরাপদ, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

নীতিমালা বনাম লটারি—কোনটি প্রাধান্য পাচ্ছে?:

বদলি হওয়া প্রকৌশলীদের একাংশের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা ২০২৫’-এর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাদের দাবি, নীতিমালায় সাধারণভাবে একই কর্মস্থলে তিন বছর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে দুই বছর দায়িত্ব পালনের বিধান থাকলেও এমন অনেক কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছে, যারা বর্তমান কর্মস্থলে মাত্র এক মাস থেকে এক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।

এখানেই তৈরি হয়েছে মৌলিক প্রশ্ন— লটারির মাধ্যমে বদলি কি বিদ্যমান নীতিমালার বিকল্প, নাকি নীতিমালার অধীনেই লটারি পরিচালিত হওয়ার কথা? এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চান ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীদের অনেকে।

মানবিক বিবেচনার জায়গা কোথায়?

শুধু চাকরির মেয়াদ নয়, বদলির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতিও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্যানসারে আক্রান্ত স্বজনের চিকিৎসা, চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীকে কাছাকাছি রাখার প্রয়োজনীয়তা কিংবা অন্যান্য গুরুতর পারিবারিক বাস্তবতা—এসব বিষয় লটারির যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কতটা বিবেচনায় এসেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তারা।

তাদের বক্তব্য, স্বচ্ছতা মানে শুধু লটারির মাধ্যমে নাম নির্ধারণ নয়; স্বচ্ছতা মানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে যুক্তিসংগত ও যাচাইযোগ্য মানদণ্ড থাকা।

কেপিআই ও ভিআইপি স্থাপনায় পদায়ন- উঠছে নিরাপত্তার প্রশ্ন:

লটারিভিত্তিক পদায়ন নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কেপিআই ও ভিআইপি এলাকার দায়িত্ব বণ্টনকে কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লটারির ফলাফলে ২০১৯ ও ২০২২ ব্যাচের কয়েকজন তুলনামূলক তরুণ ও অনভিজ্ঞ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি কার্য সহকারী বা ড্রাফটসম্যান পদ থেকে পদোন্নতি পাওয়া কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকেও গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সেকশনে পদায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের অভিযোগ অনুযায়ী, একজন পদোন্নতিপ্রাপ্ত নারী প্রকৌশলীকে গুলশানের ভিআইপি সেকশনে এবং গোপালগঞ্জের বাসিন্দা উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝাকে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা, কারিগরি দক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে—তা স্পষ্ট নয়।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের একাংশের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে ইস্টিমেট প্রস্তুত, কারিগরি মূল্যায়ন, জরুরি মেরামত এবং দায়িত্বের গোপনীয়তা—সবকিছুতেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধুমাত্র লটারির ভিত্তিতে দায়িত্ব নির্ধারণ করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও কারিগরি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

‘চেইন অব কমান্ড’ নিয়েও শঙ্কা:

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাংশের মতে, আকস্মিক ও ব্যাপক লটারিভিত্তিক বদলির কারণে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডও ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে দূরবর্তী এলাকায় আকস্মিক বদলি, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কর্মস্থল পরিবর্তন এবং পদায়নের মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্টতার অভাবে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

প্রশ্ন উঠছে—  লটারির মাধ্যমে বদলি হলে তার আগে কি ন্যূনতম যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মস্থলের গুরুত্ব এবং নিরাপত্তা-ঝুঁকির একটি পৃথক মূল্যায়ন করা হয়েছে?

গণ বদলি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী প্রশ্নের মুখে- বিভিন্ন অভিযোগ এখন তার সামনে:

লটারিভিত্তিক বদলি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে পোস্টিং বাণিজ্য, কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, আত্মীয়দের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, গোপন স্থানে অফিস পরিচালনা, রাজনৈতিক যোগাযোগ, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ তুলেছেন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নেই; বরং অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে সত্য উদঘাটনের উপযুক্ত পথ।

প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

লটারি কি সত্যিই সমাধান, নাকি নতুন ঝুঁকি?:

গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই স্বচ্ছতা যদি এমন একটি পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়, যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের সংবেদনশীলতা ও মানবিক বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচিত না হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিশেষ করে কেপিআই ও ভিআইপি স্থাপনার মতো সংবেদনশীল জায়গায় পদায়নের ক্ষেত্রে লটারির পাশাপাশি পৃথক কারিগরি ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে কি না—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিতর্কিত পদায়নগুলো দ্রুত পুনর্বিবেচনা করা হোক। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের বদলি-পদায়ন নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, লটারির মানদণ্ড কী ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কী ধরনের যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে—এসব বিষয়ে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

কারণ স্বচ্ছতার নামে লটারি নয়—প্রকৃত স্বচ্ছতা হলো এমন একটি বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থা, যেখানে সিদ্ধান্ত হবে নীতিমালা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের গুরুত্ব এবং জনস্বার্থের ভিত্তিতে।

আর গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানে সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু কর্মকর্তাদের জন্য নয়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।