
“লিয়াকত আলী লাকীর পতনের পর দুই বছরে ৫ বার রদবদল; চার পরিচালকের পদও ফাঁকা, সিদ্ধান্ত এখন সচিবালয়ে”

দেশের সংস্কৃতিচর্চার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আবারও অভিভাবকহীনতার মুখে। প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নতুন ডিজি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে শিল্পকলা কার্যালয় থেকে সংস্কৃতি অঙ্গনজুড়ে চলছে নানা মেরুকরণ ও গুঞ্জন। একদিকে যেমন বর্তমান ডিজির মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে নতুন কারও হাতে এই চাবি সোপর্দ করার গুঞ্জনও উঁকি দিচ্ছে।
সচিবালয়ে দৌড়ঝাঁপ ও বর্তমান চিত্র:
শিল্পকলা একাডেমির প্রশাসনিক ভবনে দুপুরে গিয়ে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে তার দপ্তরে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে জানান, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করছেন। মেয়াদ নবায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সরকারের। বিকালের মধ্যেই হয়তো একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানা যেতে পারে।”
একই সময়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে শিল্পকলার চার প্রধান বিভাগেও। গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর একাডেমির চার বিভাগে যে পরিচালকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের মেয়াদের ঘড়িও এখন শেষ মাথায়। ফলে একযোগে ডিজি ও চার পরিচালকের পদ খালি হতে চলায় একাডেমির দাপ্তরিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে সংস্কৃতি সচিব ইয়াসমিন বেগম জানান, মহাপরিচালক নিয়োগ সম্পর্কিত ফাইলটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে এখনই বিস্তারিত মন্তব্যের সুযোগ নেই।
’লাকী-উত্তর’ শিল্পকলা: অস্থিরতার পেছনের দিনপঞ্জি
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শিল্পকলা একাডেমির শীর্ষ পদে ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত দুই বছরে পাঁচবার ডিজি পদে রদবদল বা অতিরিক্ত দায়িত্ব হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে:
লিয়াকত আলী লাকী পর্ব (২০১১–২০২৪): দীর্ঘ ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। দুদকে তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও নজিরবিহীনভাবে সপ্তমবারের মতো তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি।
অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ (সেপ্টেম্বর ২০২৪ – ফেব্রুয়ারি ২০২৫): ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট নাট্যনির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদকে দুই বছরের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি হুট করেই পদত্যাগ করেন।
ভারপ্রাপ্ত ও সাময়িক দায়িত্ব (মার্চ ২০২৫ – সেপ্টেম্বর ২০২৫): সৈয়দ জামিল আহমেদের পদত্যাগের পর ৪ মার্চ ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হন মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেন। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল ফয়েজকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়, যিনি মাত্র এক সপ্তাহ দায়িত্ব পালন করেন।
রেজাউদ্দিন স্টালিন পর্ব (সেপ্টেম্বর ২০২৫ – সেপ্টেম্বর ২০২৪/২০২৬): অবশেষে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এক বছরের চুক্তিতে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনকে মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মেয়াদ সম্প্রতি শেষ হয়েছে।
সংস্কৃতি অঙ্গনের পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ:
সংস্কৃতি অঙ্গনের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও শিল্পকলা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঘন ঘন ডিজি পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাডেমির দীর্ঘমেয়াদী বার্ষিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক বাজেট বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
১. প্রশাসনিক স্থবিরতা: মহাপরিচালক ও চার পরিচালকের পদ একসাথে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বাজেট অনুমোদন, কর্মচারীদের পদোন্নতি এবং জেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলোর দেখভাল থমকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
২. নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা: ২০২৪-এর পটপরিবর্তনের পর শিল্পকলা একাডেমি পুনর্গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা ধারাবাহিক নেতৃত্বের অভাবে বারবার পথ হারাচ্ছে।
৩. সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি: নাট্যকার ও সংস্কৃতিকর্মীদের একাংশের মতে, শিল্পকলা একাডেমিকে কোনো অস্থায়ী বা রাজনৈতিক সুবিধাভোগের কেন্দ্র না বানিয়ে একজন প্রশাসনিক দক্ষতা ও সংস্কৃতিমুখী ভাবমূর্তিসম্পন্ন ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যাতে দ্রুত স্থবিরতা কাটিয়ে সংস্কার কার্যক্রম গতি পায়।
এখন দেখার বিষয়, সরকার কি রেজাউদ্দিন স্টালিনের ওপরই পুনরায় আস্থা রাখছে, নাকি শিল্পকলা একাডেমির চেয়ারে আসছে নতুন কোনো মুখ।
#BangladeshShilpakalaAcademy #CultureMinistryBD #RezauddinStalin #BangladeshNews #CulturalLeadership #ShilpakalaUpdate #InvestigativeReport #BangladeshCulture #BreakingNewsBD