
বিটিভির বার্তা বিভাগে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ: ইসিতে সাবেক সংবাদকর্মীর গুরুতর অভিযোগ
“নির্বাচনকালীন বিটিভি সংবাদে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, বিটিভি শীর্ষপদে পরিবর্তনের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে চিঠি, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ।”
নিরপেক্ষ সংবাদ, সার্বভৌম গণতন্ত্র ও নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের প্রশ্নে বিটিভি শীর্ষপর্যায়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শ্বাস–প্রশ্বাস। আর সেই নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ, ভারসাম্যপূর্ণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ।
কিন্তু সাম্প্রতিক এক চিঠিতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক সংবাদকর্মী যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন, তা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের সেই মৌলিক দর্শনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে—জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পরও বিটিভিতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। বরং শীর্ষ পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদের অবস্থান দৃঢ় হয়েছে, যাদের রাজনৈতিক পক্ষপাত ও অতীত কর্মকাণ্ড নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার জন্য গভীর হুমকি হয়ে উঠছে।
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, বর্তমান মহাপরিচালক, উপ–মহাপরিচালক (বার্তা), জেনারেল ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বিটিভির সংবাদ বিভাগকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের অনুকূলে পরিচালিত করছেন।
নিয়োগ, পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মতাদর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বার্তা বিভাগে একই ব্যক্তির হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ কেন্দ্রীভূত থাকা, যা প্রশাসনিক ন্যায়নীতি ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। নির্বাচনকালীন সময়ে এমন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণমাধ্যমের ভারসাম্য নষ্ট করে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সুশীল সমাজের উদ্বেগ:
এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যদি নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে কেবল একটি নির্বাচন নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ভিত্তি।”
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল মোমেন এর ভাষায়, “বিটিভি কোনো দলের নয়, এটি প্রজাতন্ত্রের সম্পদ। এখানে পক্ষপাত মানে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।”
একজন নাগরিক অধিকারকর্মী মন্তব্য করেন, “সংবাদ যখন ক্ষমতার ভাষ্য হয়ে ওঠে, তখন ভোটার সত্য জানার অধিকার হারায়। সেটি আর সংবাদ থাকে না, হয়ে ওঠে প্রোপাগান্ডা।”
সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব:
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের দায়িত্ব হলো—জাতি, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, যদি নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদ ও অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাবিত হয়, তবে তা শুধু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না—রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকেও দুর্বল করে।
বিটিভির সাবেক সংবাদ কর্মীর চিঠিতে যে নামগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে দ্রুত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
আমার টেলিভিশনের পর্যবেক্ষণ:

আমার টেলিভিশনের অনুসন্ধানে স্পষ্ট—এই অভিযোগগুলো ব্যক্তিগত আক্রোশের নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। নির্বাচন কমিশন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো—এই অভিযোগগুলোকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করা। কারণ, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে সরকার বদলায়—কিন্তু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রশ্নবিদ্ধ হলে আঘাত লাগে পুরো গণতন্ত্রে।
আমার টেলিভিশন বিশ্বাস করে— নিরপেক্ষ বিটিভি মানেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানেই জনগণের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা।