
“সুরের ইতিহাসের শেষ পাতা উল্টে গেল- চার বছর আগের এক সাক্ষাৎকার আজ স্মৃতির অমূল্য সম্পদ”
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান-এর একটি একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার। বয়সের ভারে নত হলেও তার কণ্ঠে তখনও ছিল অপার স্নিগ্ধতা, আর স্মৃতির প্রতিটি ভাঁজে লুকিয়ে ছিল বাংলা সংগীতের এক স্বর্ণালি অধ্যায়। আজ সেই কণ্ঠ স্তব্ধ—কিন্তু তার সুর অমর।
একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি শিল্পী বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। তার প্রয়াণে দেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
১৯৪৭ সালে তৎকালীন All India Radio-এর ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো তার কণ্ঠে গান প্রচারিত হয়—যা তাকে রেডিও সংগীতের অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মাত্র শৈশব থেকেই সংগীতচর্চা শুরু করা এই শিল্পী অল্প বয়সেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এ সমর দাস-এর সুরে গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও ইতিহাসের অংশ। পরবর্তীতে জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্রে এবং খান আতাউর রহমান-এর সুরে গাওয়া একাধিক গান তাকে নিয়ে যায় কিংবদন্তির উচ্চতায়।
তার কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’, ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো অসংখ্য চলচ্চিত্রের গান। পল্লিগীতি, আধুনিক, গজল—সব ধারাতেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। সেই কারণেই একসময় তাকে সংগীতাঙ্গনে “Golden Voice” হিসেবেও অভিহিত করা হতো।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি অর্জন করেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’। পাশাপাশি সমর দাস সংগীত পদকসহ আরও নানা সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৫ সালে তার কালজয়ী গান নিয়ে প্রকাশিত হয় একটি বিশেষ সংকলন অ্যালবাম, যা নতুন প্রজন্মের কাছেও তাকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে।
নাম ও পরিচয় প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
মাহবুবা রহমান নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত ও প্রামাণ্যভাবে স্বীকৃত। তবে কিছু অনানুষ্ঠানিক সূত্রে তার জন্মনাম “নিভা রানী রায়” হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়—যদিও এই তথ্যটি সব নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে নিশ্চিত নয়।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫৮ সালে তিনি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সন্তানদের মধ্যে রুমানা ইসলাম একজন সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী, যিনি মায়ের সংগীতধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
জীবনের শেষ কয়েক দশক তিনি অনেকটা নিভৃতেই কাটিয়েছেন। তবে তার গাওয়া গান কখনো নিভে যায়নি—বরং নতুন প্রজন্মের শিল্পী, বিশেষ করে গিটার শিল্পীদের পরিবেশনায় বারবার ফিরে এসেছে নতুন আবহে। তার অসংখ্য গান আজও হাওয়াইয়ান গিটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রে পরিবেশিত হয়ে সংগীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
আজ তার প্রস্থান শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়—এ যেন এক যুগের সমাপ্তি, এক ইতিহাসের অবসান।
আমার টেলিভিশন এই গুণী শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।
একইসঙ্গে বাংলাদেশ গিটার শিল্পী সংস্থা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।
তার সুর, তার কণ্ঠ, তার আবেগ—বাংলার সংগীত আকাশে চিরকাল জ্বলবে এক অমলিন নক্ষত্র হয়ে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।