জব চার্নাকের সুতানুটি–কলিকাতা–গোবিন্দপুরের ত্রয়ী গ্রাম একদিন হয়ে উঠেছিল ‘সিটি অব প্যালেসেস’।
নামকরণের ইতিহাস আজও ঘিরে আছে রহস্য, ভাষাতত্ত্ব ও পুরাণের বহু ব্যাখ্যায়।
ইংরেজ শাসনামলের অন্ধকার ও আলোকচ্ছটায় এক অনন্য শহরের জন্ম—কলকাতা। ওয়ানওয়ে সিটির আধুনিক ব্যস্ততাকে আজ আমরা স্বাভাবিক ভেবে নিলেও, এর শিকড় ছিল একদা কাদামাটি, জঙ্গল ও খাড়িবেষ্টিত গণ্ডগ্রাম। ইতিহাস বলছে, ১৬১০ সালের ২৪ আগস্ট, রোববার—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মধ্যক্ষ জব চার্নাক সুতানুটি, কলিকাতা এবং গোবিন্দপুর—এই তিনটি সরল অথচ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম একত্রিত করে প্রথম কলকাতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে মি. মেকলে এই নবীন নগরীকে আখ্যা দেন City of Palaces—প্রাসাদসম শহর।
কিন্তু ‘কলিকাতা’ নামের উৎস ঘিরে আজও রহস্যের বিস্তার। ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের মতে, আরবি থেকে আগত ‘কলি’ অর্থে অস্থির ও ‘কাতা’ অর্থে দুর্বৃত্তদল—দুটি শব্দ মিলে তৈরি হয়েছিল ‘কলিকাতা’, কারণ সে যুগে জলদস্যু ও স্থল-ডাকাতদের গুহা ছিল এই অঞ্চল। অন্য এক মত বলছে, ‘কালীক্ষেত্র’ থেকেই এসেছে ‘কলিকাতা’; ডাকাতদের আরাধ্যা দেবী কালীকে কেন্দ্র করেই এই নামের প্রচলন। আবার ভূগোলবিদদের কাছে এই এলাকার খাড়িবেষ্টিত চ্যাপ্টা ভূপ্রকৃতি ‘কিলকিলা’ শব্দে পরিচিত ছিল—যা থেকেই নাকি পরে সৃষ্টি হয় ‘কলকাতা’। কেউ কেউ বলেন, খাল বা ‘খাল’ শব্দটির সঙ্গে ‘কাট্টা’ যুক্ত হয়ে মাটি কাটার অঞ্চলকে কলকাতা বলা শুরু হয়। এমনকি স্থানীয় কলিচুন ও নারকেল দড়ি—‘কলি’ ও ‘কাতা’—এর উৎপাদনকেও অনেকে নামের উৎস হিসেবে ধরে নেন।
এইসব মতের ভিন্নতা কলকাতার নামের ভাঁজে যেন যোগ করেছে আরও রহস্যময় সৌন্দর্য। গণ্ডগ্রাম থেকে মহানগর, ডাকাতের আশ্রয় থেকে সাংস্কৃতিক রাজধানী—কলকাতার ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়, শহর শুধু ইঁট-কাঠের গড়ন নয়, বরং সময়, মানুষ ও কল্পনার সম্মিলিত সৃজন। এবারকার ফিচার সেই অনন্ত যাত্রারই এক নান্দনিক পুনর্নির্মাণ।
