
গুলিস্তান সিনেমা হল: ঢাকার ইতিহাসে সাংস্কৃতিক হৃদস্পন্দনের অমর প্রতীক
“ঢাকার প্রথম এসি প্রেক্ষাগৃহ ও নগর জীবনের নতুন স্বাদ।লিবার্টি থেকে গুলিস্তান: নাম বদলের নেপথ্য কাব্য।”
ঢাকার বুকে এক সময় যে প্রেক্ষাগৃহটিকে ঘিরে নগরের সংস্কৃতি, শিল্প ও আড্ডার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল, তার নাম গুলিস্তান সিনেমা হল। এটি শুধু একটি সিনেমা হল ছিল না—বরং পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ, যা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতার দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তৃত ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান জুড়ে। বিশেষত কোকা-কোলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাবানি বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড-এর মালিক ছিলেন তিনি। দোশানি কেবল ব্যবসায়ী নন; তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রপ্রেমী, যিনি ঢাকায় আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
১৯৫০–৫৩ সালের মধ্যে তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় লিবার্টি সিনেমা হল। এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রিন্স আগা খান ১৯৫৩ সালে। সেই সময় ঢাকায় এ ধরণের সুবিশাল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। তাই গুলিস্তানকে বলা হয় ঢাকার প্রথম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (AC) প্রেক্ষাগৃহ।
“গুলিস্তান” নামের উৎস ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল:
প্রথমে এর নাম ছিল লিবার্টি। পরবর্তীতে নাম বদলে রাখা হয় গুলিস্তান—পারস্য ভাষার শব্দ, যার অর্থ ফুলের বাগান।
এ নামের সঙ্গে রয়েছে দুটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা—
১. নাম পরিবর্তনের পর প্রেক্ষাগৃহটির পরিচিতিই এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে পুরো অঞ্চলই “গুলিস্তান” নামে পরিচিতি লাভ করে।
২. জনশ্রুতি আছে, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে প্রেক্ষাগৃহটির আশপাশে সত্যিই একটি ফুলের বাগান ছিল, যেখানে সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের আড্ডা জমত রাতভর। সেই আড্ডার সঙ্গী ছিল ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের ট্রেনের হুইসেল অথবা হলের পূর্বদিকে রাখা মোঘল আমলের এক কামান, যার গায়ে হেলান দিয়ে চলত অন্তহীন আলাপচারিতা।
প্রথম প্রদর্শিত চলচ্চিত্র:
গুলিস্তান সিনেমা হলের পর্দায় প্রথম প্রদর্শিত হয় পাকিস্তানি চলচ্চিত্র “আম্বার” (১৯৫২)। এ ছবিই ছিল গুলিস্তানের আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা। এ সিনেমার সাফল্য গুলিস্তানকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে, আর ঢাকার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের প্রধান আড্ডাস্থল হয়ে ওঠে এই প্রেক্ষাগৃহ।
ঢাকার সাংস্কৃতিক হৃদয়:
গুলিস্তান শুধু প্রেক্ষাগৃহ নয়, এটি ছিল সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। আশপাশে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, যেমন—আনিস ফিল্ম কর্পোরেশন। এখান থেকেই তৈরি হয়েছিল একাধিক নামকরা চলচ্চিত্র, যার মধ্যে অন্যতম বসুন্ধরা।
এলাকায় ছিল চু চিং চৌ নামে ঢাকার প্রথম দিককার চাইনিজ রেস্তোরাঁ, ছিল বার এবং আরও বহু আড্ডাকেন্দ্র। প্রখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের পদচারণা, প্রযোজক-পরিচালকদের আনাগোনা—সব মিলিয়ে ১৯৫০–৬০-এর দশকে গুলিস্তান হয়ে ওঠে শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
স্বাধীনতার পর পরিবর্তন:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দোশানি পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। তাঁদের সম্পদ, যার মধ্যে গুলিস্তান সিনেমা হল ও তাবানি বেভারেজ অন্তর্ভুক্ত ছিল, গণ্য হয় পরিত্যক্ত বা শত্রু-সম্পত্তি হিসেবে।
১৯৭২ সালে সরকার এই সম্পত্তি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে নিয়ে আসে। সেই থেকে গুলিস্তান সিনেমা হল ও পরবর্তীতে গড়ে ওঠা কমপ্লেক্স মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যবহৃত হতে থাকে।
লিবার্টি থেকে গুলিস্তান, প্রথম প্রদর্শিত আম্বার থেকে বসুন্ধরার সাফল্য, আগা খানের উদ্বোধন থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনস্থ কমপ্লেক্সে রূপান্তর—গুলিস্তান সিনেমা হলের প্রতিটি অধ্যায় ঢাকার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন।
যদিও ২০০৫ সালে এই প্রেক্ষাগৃহ ভেঙে ফেলা হয়েছে, তবু গুলিস্তান আজও টিকে আছে ঢাকার মানুষের স্মৃতিতে—ফুলের বাগানের মতোই সুগন্ধ ছড়িয়ে, ইতিহাসের এক উজ্জ্বল প্রতীকে রূপান্তরিত হয়ে।