
“সংস্কৃতি যখন আত্মপরিচয়ের মূল, তখন তার অবক্ষয় মানে জাতিসত্তার নীরব অবলুপ্তি”
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আজ এক গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে—এটি কেবল শিল্পের সংকট নয়, এটি রুচির সংকট, চেতনার সংকট, এবং সর্বোপরি সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের সংকট। যে সংস্কৃতি একসময় এ দেশের মানুষের আত্মপরিচয়, মনন ও মানবিকতার ভিত্তি গড়ে তুলেছিল, আজ সেই সংস্কৃতিই ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার নিজস্বতা।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন—
“নিজের সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে কোনো জাতি বড় হতে পারে না।”
এই বাণী আজ যেন আরও প্রাসঙ্গিক। কারণ, আমাদের সংস্কৃতির ভেতরেই এখন প্রবেশ করেছে এক ধরনের নীরব আগ্রাসন—অপসংস্কৃতির আধিপত্যবাদ। এটি বাহ্যিক নয়, বরং অন্তর্গত; এটি বিনোদনের মোড়কে, আধুনিকতার নামে, এবং জনপ্রিয়তার আড়ালে ধীরে ধীরে আমাদের শিকড়কে দুর্বল করে দিচ্ছে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সৃষ্টিতে বারবার আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার কথা বলেছেন—
“পরের মুকুট পরে নিজের মাথা উঁচু হয় না।”
আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখছি—সাংস্কৃতিক চর্চা ক্রমেই হয়ে উঠছে প্রদর্শনভিত্তিক, গভীরতাহীন এবং বাজারনির্ভর। শিল্পের স্থানে স্থান করে নিচ্ছে চটকদারতা, মৌলিকতার জায়গা দখল করছে অনুকরণ, আর সাধনার জায়গায় বসছে শর্টকাট খ্যাতির মোহ।
সংকটের স্তরবিন্যাস:
১. সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের অবক্ষয়: নিজস্ব ভাষা, সুর, ঐতিহ্য ও শিল্পরীতির প্রতি অবহেলা বাড়ছে। বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণে আমরা হারাচ্ছি আমাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর।
২. অপসংস্কৃতির আধিপত্যবাদ: অশালীনতা, কৃত্রিমতা ও ভোগবাদী উপস্থাপনাকে ‘ট্রেন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি কেবল রুচিকে বিকৃত করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের মানসিক গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
৩. মিডিয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার সংকট: গণমাধ্যমগুলোতে প্রকৃত শিল্পের জায়গা সংকুচিত। অর্থনির্ভর প্রচার, দলীয়করণ, এবং চাটুকারিতার সংস্কৃতি প্রকৃত শিল্পীদের প্রান্তিক করে দিচ্ছে।
৪. চর্চা ও শিক্ষার অভাব: গুরু-শিষ্য পরম্পরা ভেঙে পড়েছে। সাধনার জায়গায় এসেছে তাড়াহুড়ো করে ‘শিল্পী’ হয়ে ওঠার প্রবণতা।
সম্ভাবনার আলো:
তবুও, সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়। দেশের নানা প্রান্তে কিছু নিষ্ঠাবান শিল্পী, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মী এখনও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা জানেন—সংস্কৃতি কোনো পণ্য নয়, এটি একটি জাতির আত্মার ভাষা। এই চেতনা থেকেই পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
উপসংহার:
সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা মানে কেবল ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়—এটি একটি প্রতিরোধ, একটি অবস্থান। অপসংস্কৃতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে, রুচির অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, এবং আত্মপরিচয়ের বিলুপ্তির বিরুদ্ধে।
এখন সময়—
সংস্কৃতিকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার, শিল্পকে আবার সাধনার আসনে বসানোর, এবং জাতিসত্তাকে তার নিজস্ব আলোয় উদ্ভাসিত করার।