
“১৯৮৫-এর সেই সংবাদ সম্মেলন কি ছিল একজন অসহায় নারীর শেষ আর্তনাদ? দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, কর্মজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা, সন্তান থেকে দূরত্ব ও মানসিক বিপর্যয়ের অভিযোগ—জয়শ্রীর করুণ পরিণতির দায় নিয়ে আজও রয়ে গেছে বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন”
১৯৮৫ সালের জানুয়ারি। ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি বাসা। চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের সামনে বসে আছেন এক সময়ের রূপালী পর্দার আলোচিত অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির। অথচ সেদিনের জয়শ্রী যেন সেই পরিচিত জয়শ্রী নন।
যে মুখ একসময় পর্দায় দর্শকের চোখ আটকে রাখত, সেই মুখে তখন ক্লান্তি, অসুস্থতা আর গভীর বিষাদের ছাপ। টানাটানা চোখ যেন কোটরের গভীরে ঢুকে গেছে। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজাচ্ছেন তিনি। কণ্ঠস্বর জড়িয়ে আসছে। ক্যামেরার ক্লিক-ক্লিক শব্দে তিনি চোখ নামিয়ে নিচ্ছেন।
সাংবাদিকদের সামনে বসে থাকা এই নারী একসময় ছিলেন ‘সূর্যকন্যা’ ও ‘সীমানা পেরিয়ে’-এর পরিচিত মুখ—রূপালী পর্দার লাস্যময়ী, আত্মবিশ্বাসী জয়শ্রী। কিন্তু সেদিন তাঁর কথায় ছিল তারকা-জীবনের কোনো অহংকার নয়; ছিল বেঁচে থাকার আকুতি।
তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন—তিনি অসুস্থ, আশ্রয়হীন, অনাহারে এবং বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশি নারী হিসেবে বিয়ে করে বাংলাদেশের মাটি-আলো-বাতাসের সঙ্গে মিশে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাবি ছিল, তিনি ভয়ংকর এক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। তিনি তাঁর একমাত্র সন্তানকে বুকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন।
এই বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ আজও ইতিহাসের কাছে একটি প্রশ্ন। দাম্পত্যের ভাঙন কোথা থেকে?
জয়শ্রীর বয়ান অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে পরিচালক আলমগীর কবিরের দাম্পত্য অশান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ছিল ‘মহানায়ক’ চলচ্চিত্র। জয়শ্রী নিজে ছবিটিতে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আলমগীর কবির তাঁকে না নিয়ে কলকাতা থেকে তাঁর ছোটবোন সুমিতা চৌধুরীকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—এমনটাই উঠে আসে জয়শ্রীর বক্তব্যে।
এ সিদ্ধান্ত জয়শ্রী মেনে নিতে পারেননি। তিনি সুমিতাকে বাদ দেওয়ার জন্য স্বামীকে চাপ দিয়েছিলেন বলেও তাঁর বক্তব্যে দাবি করা হয়। কিন্তু কবির তাঁর কথা রাখেননি।
এরপরই কি দাম্পত্য সম্পর্কে চিড় আরও গভীর হয়েছিল?
আরও গুরুতর অভিযোগ ছিল—সুমিতা চৌধুরীকে ঘিরে আলমগীর কবিরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে জয়শ্রীর মনে সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এমনকি ‘মহানায়ক’-এর শুটিং-পরিবেশ নিয়েও নানা কথা ছড়িয়েছিল বলে বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে।
একজন নারীকে কি ধীরে ধীরে একা করে দেওয়া হয়েছিল?
জয়শ্রীর অভিযোগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ ছিল তাঁর কর্মজীবন ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার বর্ণনা। তাঁর দাবি ছিল, স্বামী তাঁকে অন্য পরিচালকের চলচ্চিত্রে কাজ করতে দিতেন না। ঘরে রেখে কাজে চলে যেতেন। এমনকি দরজায় তালা দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছিলেন। যোগাযোগ যাতে সীমিত থাকে, সে জন্য টেলিফোন নিয়েও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল।
অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি নিছক দাম্পত্য কলহের বিষয় নয়; বরং একজন শিল্পীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও সামাজিক অস্তিত্ব সংকুচিত হওয়ার একটি গভীরতর চিত্র।
কিন্তু আবারও প্রশ্ন—এসব কি কেবল জয়শ্রীর বক্তব্য, নাকি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় এমন ঘটনা? ইতিহাসের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এখানেই থেমে যেতে পারে না।
অসুস্থতা, পেথিড্রিন এবং ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ তকমার প্রশ্ন:
জয়শ্রীর বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক চাপের কথা। সন্তান জন্মের পর তাঁর ব্যথা বাড়ত এবং ব্যথা উপশমে পেথিড্রিন দেওয়া হতো—এমন দাবি রয়েছে। তিনি জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর চিকিৎসাধীন ছিলেন বলেও বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল—কাজের মধ্যে থাকলে হয়তো তাঁর ব্যথা ও মানসিক চাপ কমতে পারে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কাজ করার সুযোগ পাননি।.আর এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন— কোনো অসুস্থ মানুষকে যদি চিকিৎসা, কর্মজীবন, সামাজিক যোগাযোগ ও পারিবারিক নিরাপত্তা—সবকিছু থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, তবে তার মানসিক ও শারীরিক অবস্থার অবনতি কি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে না?
জয়শ্রীর আরও অভিযোগ ছিল, তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁর পেথিড্রিন-নির্ভরতার অভিযোগও সংবাদপত্রে দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছিলেন। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সেই সময়কার পত্রিকার কপি, চিকিৎসা-রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নথি পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়—সন্তান থেকে বিচ্ছেদ:
একজন মায়ের কাছে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা গভীর হতে পারে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। জয়শ্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর একমাত্র সন্তান লেলিন কবির ওরফে বাবুকেও তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
যদি এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে—একজন অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মাকে তাঁর সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করা তাঁর পুনরুদ্ধারের পথে সহায়ক ছিল, নাকি আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছিল?
নিজের পরিবার থেকেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিযোগ:
জয়শ্রীর বক্তব্যে স্বামী ছাড়াও তাঁর নিজের মা ও বোনদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল। তিনি দাবি করেছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় আশ্রয়ের জন্য মায়ের কাছে গিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। বোনেরাও তাঁর পাশে দাঁড়াননি বলে তাঁর অভিযোগ ছিল। তাঁর ভাষ্যে, পরিবারের কাছে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন একটি ‘আপদ’। তাঁর জীবনে একমাত্র নির্ভরতার জায়গা ছিলেন বাবা—এমন অনুভূতিও তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায়।
বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ভেতরের নিরাপত্তাবোধ আরও ভেঙে পড়ে—এমন একটি মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও এখানে পাওয়া যায়।
পালিয়ে আশ্রয়—তারপরও কি মুক্তি মেলেনি?:
পরিস্থিতি যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন জয়শ্রী কবিরের বাসা থেকে বেরিয়ে অভিনেত্রী সুমিতা দেবীর বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও তাঁর জীবনের সংকট শেষ হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, সুমিতা দেবী ও ফরিদ উদ্দিন নীরদ তাঁকে দিয়ে তালাকনামায় স্বাক্ষর করিয়েছিলেন।.এই অভিযোগ সত্য হলে সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়—জয়শ্রী কি স্বাধীন ও সচেতন সিদ্ধান্তে তালাকনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন, নাকি তাঁর অসুস্থ ও বিপর্যস্ত অবস্থাকে কাজে লাগানো হয়েছিল? এর উত্তর আজও ইতিহাসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে আলমগীর কবিরের দায় কতখানি?
এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘দোষী’ বা ‘নির্দোষ’ শব্দে দেওয়া দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাজ নয়—বিশেষ করে যখন এখানে উপস্থাপিত তথ্যের বড় অংশই জয়শ্রীর বক্তব্য ও পরবর্তী বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। তবে অভিযোগগুলোর ধারাবাহিকতা একটি গুরুতর অনুসন্ধানী প্রশ্ন তৈরি করে।
যদি প্রমাণিত হয় যে—.জয়শ্রীকে ইচ্ছাকৃতভাবে কর্মজীবন থেকে দূরে রাখা হয়েছিল;.তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল;.চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসনের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়নি; তাঁর সন্তানকে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল; তাঁর অসুস্থতাকে ব্যবহার করে তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল;.এবং এসব কর্মকাণ্ড তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবনতিকে ত্বরান্বিত করেছিল— তাহলে আলমগীর কবিরের ভূমিকা নিছক একটি দাম্পত্য বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল কি না, তা অবশ্যই গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
কিন্তু কাউকে ‘মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য দায়ী’ বা মৃত্যুর কারণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করতে হলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ, চিকিৎসা-নথি, সাক্ষ্য এবং ঐতিহাসিক দলিল প্রয়োজন।
একজন নায়িকার মৃত্যু, নাকি একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা?
জয়শ্রীর গল্পকে শুধু একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিই বাদ পড়ে যাবে।.এটি হতে পারে একজন নারীর আত্মপরিচয় হারানোর গল্প।.একজন শিল্পীর কর্মক্ষেত্র হারানোর গল্প।.একজন স্ত্রীর দাম্পত্য নিরাপত্তা হারানোর গল্প।.একজন মায়ের সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গল্প।
এবং সর্বোপরি—একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো নিরাপদ আশ্রয় ক্রমে হারিয়ে ফেলার গল্প।
১৯৮৫ সালের সেই সংবাদ সম্মেলনে জয়শ্রী বলেছিলেন—“আমি বাঁচতে চাই।”.এই একটি বাক্যই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে নির্মম প্রতীক।.তিনি তখন শুধু চিকিৎসা চাইছিলেন না। তিনি চাইছিলেন স্বাভাবিকভাবে বাঁচার অধিকার, কাজ করার অধিকার, সন্তানের কাছে থাকার অধিকার এবং একজন মানুষ হিসেবে মর্যাদা।
তাঁর শেষ পরিণতির জন্য কে কতটা দায়ী—সেই সিদ্ধান্ত ইতিহাস ও প্রমাণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই ন্যায়সংগত।
তবে একটি প্রশ্ন আজও থেকে যায়— একজন মানুষ যখন মৃত্যুর আগে বারবার বলে যায়, “আমি বাঁচতে চাই”—তখন তাঁর সেই আর্তনাদ আমরা কতটা শুনেছিলাম? আরও বড় প্রশ্ন— জয়শ্রী কি কেবল অসুস্থ হয়ে ভেঙে পড়েছিলেন, নাকি সম্পর্ক, বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক চাপ ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগগুলো তাঁর পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই হতে পারে জয়শ্রীর প্রতি সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচার।