
“শেরশাহর আমলের কাঁচুলি থেকে ব্রিটিশ শাসনকাল—ব্লাউজের ইতিহাস, সমাজ ও ফ্যাশনের বিবর্তন”
খুব বেশি দূরের কথা নয়—একসময় ভারতবর্ষের নারীরা শাড়ি পরলেও ঊর্ধ্বাঙ্গে আলাদা কোনো পোশাক ব্যবহার করতেন না। শাড়ির প্রচলন থাকলেও শাড়ির নিচে কী পরতে হবে, সে বিষয়ে সমাজে তখনো কোনো নির্দিষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি। ফলে বহু অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলায়, নারীরা শাড়ির সঙ্গে বক্ষ উন্মুক্ত রেখেই চলাফেরা করতেন। এমনকি রানি ভিক্টোরিয়ার শাসনামলেও বাংলার কোনো কোনো নারী শাড়ির নিচে ব্লাউজ পরতেন না—যা ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিতে শালীনতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হতো।
ব্লাউজ শব্দটি ইংরেজি; যার শাব্দিক অর্থ ঢোলা বহির্বাস। তবে উপমহাদেশে এর ব্যবহারিক ধারণা শুরু হয় আরও আগে—শেরশাহ সূরির আমলে। সে সময় নারীরা চাকমা নারীদের মতো এক টুকরো কাপড় বুকে বেঁধে রাখতেন। এই পোশাকটিকে তখন ‘কাঁচুলি’ বলা হতো। আবার অনেকেই একে বক্ষবন্ধনী নামেও অভিহিত করতেন।
ভারতবর্ষে ব্লাউজের ব্যাপক প্রচলন ঘটে ইংরেজ শাসনামলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে ইংরেজ নারীরাও এ দেশে আসেন। তারা উপরে ছেলেদের শার্টের আদলে ব্লাউজ এবং নিচে লং স্কার্ট পরতেন। এই ভিন্নধর্মী পোশাকশৈলী ভারতীয় নারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাতিজি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজ পরার রীতি চালু করেন। ধীরে ধীরে তা সমাজের শিক্ষিত ও ধনিক শ্রেণির নারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়—সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীকে ব্রিটিশ শাসনামলে একটি ক্লাবে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়, কারণ তিনি শাড়ির নিচে ব্লাউজ পরেননি। এই সামাজিক অপমান ও অভিজ্ঞতা থেকেই আধুনিক ব্লাউজের কাঠামোগত ধারণা গড়ে ওঠে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
১৮৯০ সাল থেকে ব্লাউজ ধীরে ধীরে ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তখন একটি সাধারণ ব্লাউজ ও একটি প্লেন স্কার্ট উঠতি বয়সী তরুণীদের আদর্শ পোশাক হিসেবে বিবেচিত হতো। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১৯০০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে সমাজে নারীর অবস্থান, শিক্ষা ও সচেতনতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্লাউজের নকশা, কাট এবং স্টাইলেও আসে বৈচিত্র্য।
আজকের দিনে ব্লাউজ কেবল শাড়ির অনুষঙ্গ নয়—এটি সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহনকারী একটি পোশাক। বাঙালি নারীর শালীনতা, আত্মপরিচয় ও সামাজিক অভিযোজনের ইতিহাসে ব্লাউজ হয়ে উঠেছে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
