
“সুরকারের বিশ্বাসে জন্ম নেওয়া এক অবিনাশী কণ্ঠ, যে কণ্ঠ আজও সময় ছুঁয়ে থাকে”
সলিল চৌধুরীর সুরের গভীরে প্রবেশ করার সাহস যাঁর ছিল, তিনিই দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। ‘পল্লবিনী গো সঞ্চারিণী’ গানটি গাওয়ার প্রস্তাবে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তিনি—নিজের কণ্ঠ সেই সুরের ভার নিতে পারবে কিনা, সেই সংশয় ছিল শিল্পীর মনে। কিন্তু সুরকার জানতেন তাঁর সৃষ্টির নাড়িনক্ষত্র। প্রায় জেদের সুরেই সলিলবাবু গানটি রেকর্ড করান দ্বিজেনবাবুর কণ্ঠে। আর তারপর—ইতিহাস। গানটি হয়ে ওঠে কালজয়ী, শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আশ্রয় পায়।
দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় বাঙালি সংগীতজগতের এক অনন্য অধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীত ও বাংলা আধুনিক গানে তাঁর কণ্ঠে ছিল সংযম, গভীরতা আর নিখাদ আবেগের অপূর্ব মেলবন্ধন। চল্লিশের দশকের শেষ ভাগে সলিল চৌধুরীর সুরে গাওয়া তাঁর গানগুলো শ্রোতাদের মনে এক নতুন ভাষা সৃষ্টি করে। পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রাপ্তি ছিল তাঁর শিল্পসাধনার এক স্বীকৃত চিহ্ন।
১৯২৭ সালের ১২ নভেম্বর জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর পেশাদার সংগীতজীবন শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। ১৯৪৫ সালে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রথম গান রেকর্ড করেন তিনি। প্রায় দেড় হাজার গানের মধ্যে প্রায় আটশোটি রবীন্দ্রসংগীত—সংখ্যার চেয়েও যার মূল্য গভীরতায়, নিষ্ঠায় ও শুদ্ধতায়।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে মনে পড়ে সেই পঙ্ক্তিগুলো—
“এক দিন ফিরে যাব চলে
এ ঘর শূন্য করে, বাঁধন ছিন্ন করে
যদি চাহ যেও ভুলে”
তিনি ফিরে গেছেন বটে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠ—ভুলে যাওয়ার নয়। সুরের আকাশে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় আজও এক নীরব, দীপ্ত নক্ষত্র।