
বিমূর্ত রাত্রির মতো নিঃশব্দে চলে গেলেন জয়শ্রী কবির— নীরব সৌন্দর্য ও চিরন্তন স্মৃতির প্রতীক

“বিমূর্ত এই রাত্রির মতোই নীরবে বিদায় নিলেন জয়শ্রী কবির—যাঁর মুখে গান, চোখে ছিল নীরবতা, আর বাংলা চলচ্চিত্রে রয়ে গেল এক চিরন্তন বিষণ্ন সৌন্দর্যের ছায়া।”
বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনবদ্য মুখ, অভিনেত্রী জয়শ্রী কবির সন্ন্যাসী থিয়েটারের মতো নির্জনে চিরশান্তিতে ঢুকে পড়লেন। তিনি ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ইংল্যান্ডের লন্ডন-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন, অবস্থান ছিল রোমফোর্ড, এসেক্সের এক নার্সিং হোমে। এটি শোকে মোড়ানো বাংলা ও বঙ্গীয় চলচ্চিত্র সম্প্রদায়ের জন্য এক গভীর ক্ষতি।
জয়শ্রী কবিরের জন্ম ১৯৫২ সালে কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গ) “জয়শ্রী রায়” নামে হয়েছিল। তিনি তাঁর স্কুল-জীবনে সাউথ পয়েন্ট স্কুল-এ অধ্যয়নকালে ১৯৬৮ সালে মিস ক্যালকাটা খেতাব অর্জন করেন, যা ছাত্রজীবনেই চলচ্চিত্রের দিকে তাঁর পদচিহ্ন রাখে।
চলচ্চিত্র ভ্রমণ ও চলচ্চিত্র জীবন:
জয়শ্রী কবিরের সিনেমায় যাত্রা শুরু হয় বিশ্বনন্দিত পরিচালক সত্যজিৎ রায়-এর পানে থেকে। তিনি ১৯৬৯ সালের “প্রতিদ্বন্দ্বী” চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বাংলা ও সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে পরিচিত হন, যা তাঁর অভিনয় জীবনের স্টার্টিং পয়েন্ট ছিল।
কলকাতার পর্দার পরিসরে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বাংলা চলচ্চিত্রে অংশ নেন। এমনকি উভয় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের উত্তম কুমারের মতো বৃহৎ অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করে তিনি প্রভাব ফেলেন।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পরিচয় সুদৃঢ় করেন, যেখানে তিনি পরিচালক আলমগীর কবির এর সহচর নায়িকা হিসেবে অসংখ্য সিনেমায় কাজ করেন, যেমন— সীমানা পেরিয়ে, রূপালি সৈকতে, সূর্য কন্যা, মোহনা। এ চলচ্চিত্রগুলো বাংলা ও ঢালিউড (বাংলাদেশ) দুই প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রকে নতুন মাত্রা দেয়। বিশেষ করে সীমানা পেরিয়ে-এর গান “বিমূর্ত এই রাত্রি আমার…” আজও দর্শকদের স্মৃতিতে অম্লান।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রবাস জীবন:
জয়শ্রী কবিরের ব্যক্তিগত জীবন একইভাবে উত্তেজনাপূর্ণ; ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরিচালক আলমগীর কবির-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন দাম্পত্যে এক পুত্র সন্তান লেনিন সৌরভ কবির-এর জন্ম হলেও, পারিবারিক জীবনে সুদীর্ঘ স্থায়িত্ব হয়নি এবং কয়েক বছর পর তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। আলমগীর কবিরের মৃত্যু ঘটে ১৯৮৯ সালে।
বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে লন্ডন, যুক্তরাজ্য-এ বসবাস স্থির করেন। সেখানে তিনি প্রায়শই জনজীবন থেকে বিরত থেকে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য শেখানো-সহ ছোট-খাটো মাধ্যমিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতেন।
জয়শ্রী কবির দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ থাকায় গত কয়েক বছর তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন, এবং সর্বশেষ দিনগুলোতে লন্ডনে তার পাশের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে ছিলেন।
জয়শ্রী কবির বাংলা ও ঢালিউড দুই জগতেই এমন একটি অভিনেত্রী ছিলেন, যিনি কল্যাণময়ী সৌন্দর্য, নিখাদ অভিনয় ও দৃঢ় অনুরাগের সমন্বয় তৈরি করেছিলেন। তাঁর কাজ আজও বাংলা সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে জীবন্ত, এবং তাঁর প্রস্থান বাংলা চলচ্চিত্রের এক কালজয়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি। চিরশান্তি কামনা করছি এই অভিনেত্রীদের আত্মার জন্য।